
রাসেল আহমেদ:
খুলনা আদালতপাড়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর জোড়া হত্যাকাণ্ডের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকজন, তবে মামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা এখনো অধরা। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও তদন্তের গতি নিয়ে নগরজুড়ে বাড়ছে নানা প্রশ্ন।গত বছরের ৩০ নভেম্বর দুপুর। আদালতের প্রধান প্রবেশপথের সামনে মোটরসাইকেলে বসে ও দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন দুই যুবক। আচমকাই সেখানে হামলা চালায় একদল অস্ত্রধারী। মুহূর্তেই গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে আদালত এলাকা। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় দুই যুবকের।নিহতরা হলেন নগরীর নতুন বাজার এলাকার হাসিব হাওলাদার ও রূপসার বাগমারা গ্রামের ফজলে রাব্বি রাজন। আদালতে হাজিরা শেষে বের হয়ে তারা গেটের ডান পাশে অবস্থান করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা ছিল অত্যন্ত সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আদালতের পাশের উদয়ন স্কুল সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায়। হামলার সময় পুরো আদালত এলাকা আতঙ্কে ফাঁকা হয়ে পড়ে।তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ঘটনার আগের রাতেই রূপসার আইচগাতি ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকায় একটি অফিসে বসে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে খুলনার একটি বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ইমরানের নেতৃত্বে হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। ওই বৈঠকেই অংশগ্রহণকারীদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।পরদিন সকাল থেকে হামলাকারীরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেয়। পরে আদালত চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে তারা। সুযোগ বুঝে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হামলা চালানো হয়।আদালতপাড়ার এক চা বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামলায় অন্তত আট থেকে নয়জন অংশ নেয়। তারা খুব দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে পুরো কাজ শেষ করে। তিন মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হামলাকারীরা। দিনের বেলায় আদালতের সামনে এমন হত্যাকাণ্ড আগে দেখেননি বলে জানান তিনি।মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার ওসি (তদন্ত) মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত রিপন, এজাজ, চিংড়ি পলাশ, হৃদয় ও আলিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্প্রতি সাইফি নামে আরও এক সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে। তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে।তিনি বলেন, নিহত দু’জন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশের সহযোগী ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবার নিয়ে প্রতিপক্ষ একটি বাহিনীর সঙ্গে তাদের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনাস্থলে লবি, ইমরান ও এজাজ সরাসরি গুলি চালায়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে চারটি গুলির খোসা, একটি চাপাতি ও চাপাতির ভাঙা হাতল উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া নিহতদের পাশ থেকে দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়, যার একটি ছিল নম্বরবিহীন।তবে তদন্তের ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা নিজেও। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে না আসায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। নিহতদের পরিবার মামলা না করায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে।এদিকে, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, প্রকাশ্যে সংঘটিত এমন হত্যাকাণ্ডের মূল হোতারা এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
