
এম আবু হেনা সাগর, ঈদগাঁও
ইতিহাসের ধূলিকণা যেখানে গল্প বলে, সবুজ প্রকৃতি সেখানে মেতে ওঠে রূপের মিতালিতে। মোঘল শাহজাদার স্মৃতিবিজড়িত নাম আর শত বছরের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনন্য জনপদ ঐতিহ্যবাহী কক্সবাজারে ঈদগাঁও ইউনিয়ন।জানেন কি, কীভাবে এলো এই ‘ঈদগাঁও’ নাম? দক্ষিণ চট্টলার বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্রের ইতিহাস প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার গল্প।প্রায় চারশত বছর আগের কথা। ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দ।ক্ষমতার লড়াইয়ে রক্তাক্ত মোগল সিংহাসন। প্রাণ বাঁচাতে আরাকানের দিকে ছুটছেন শাহ সুজা। ক্লান্ত কাফেলা তাঁবু ফেলল এক অচেনা নদীর কূলে,যার নাম ছিল ‘নয়াবাদ’। ঠিক তখনই আকাশে উঠল ঈদের চাঁদ। রাজপুত্র তার বাহিনী নিয়ে এ খোলা প্রান্তরেই সেজদাহ্ দিলেন ঈদের নামাজে। রাজপুত্রের সেই ঈদের স্মৃতি আর ইবাদতের মাঠ জড়িয়ে কালের পরিক্রমায় চার শত বছর পর এই জনপদের নাম হল ‘ঈদগাঁও’।বর্তমানে অসংখ্য মানুষের এক প্রাণবন্ত জনপদ এটি।শিক্ষার আলোয় অনন্য এই ঈদগাঁও। উচ্চ শিক্ষা প্রসারে এখানে রয়েছে স্বনামধন্য ঈদগাঁও রশিদ আহমদ কলেজ,ঈদগাহ আলমাছিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতন,শাহ জব্বারিয়া আদর্শ আলিম মাদ্রাসাসহ বহু স্কুল ও মাদ্রাসা। একইভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অপূর্ব নিদর্শন এই মাটি। পুরো ইউনিয়নে মুসলিম উম্মাহর ইবাদতের জন্য রয়েছে ৫৩ টির বেশি জামে মসজিদ, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য রয়েছে কটি প্রাচীন মন্দির। যেখানে সবাই যুগ যুগ ধরে এক পরম শান্তিতে বসবাস করছেন।প্রকৃতি নিজ হাতে রূপের পসরা সাজিয়ে রেখেছে। মেহেরঘোনা ফরেস্ট উদ্যানে ঢুকলেই চোখে পড়বে সারি সারি আকাশছোঁয়া গর্জন গাছ, যার নিচে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। বিকেলে শান্তিতে ঘুরে বেড়ানো ও বন্ধুদের সাথে পিকনিক কিংবা সুন্দর কিছু ছবি তোলার জন্য এটা কিন্তু একদম পারফেক্ট একটা জায়গা। তবে আসল চমক লুকিয়ে আছে এখান কার রাস্তায়। মেহেরঘোনা টু মাইজপাড়া সড়কটি দেখলে মনে হবে শিল্পী যেন নিখুঁতভাবে তুলি দিয়ে সবুজ রঙ করে দিয়েছেন। ঈদগাঁও হতেই ঈদগড়ের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে যখন যাবেন, বাতাসের দোলায় আপনার সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে মন শান্তিতে ভরে উঠবে।এখানকার সংস্কৃতিতে মিশে আছে চাঁটগাঁইয়া ঐতিহ্যের চাটুকারিতা,মেজবান ও আতিথেয়তা। তবে সময়ের আবর্তনে হারিয়েছে অনেক কিছু। একসময়ের প্রমত্তা ঈদগাঁও নদীর বুকে পাল তোলা নৌকার সেই রূপ, মাঝিদের সারি গান ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাধুলা আধুনিকতার ভিড়ে কিছুটা ম্লান,যা জনপদের হারানো ঐতিহ্য।এখানে প্রতিদিনই থাকে ক্রেতা-বিক্রেতার সরব উপস্থিতি। আর সপ্তাহে দুদিন বসে গরু-মহিষের হাট,যেখানে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে অসংখ্য মানুষ বেচাকেনার জন্য ছুটে আসেন।দিনশেষে প্রতিটি জনপদের একটা নিজস্ব সুর থাকে। ঈদগাঁওয়ের সেই সুরটি মিশে আছে তার ব্যস্ত বাজারের কোলাহলে, মেহেরঘোনার গর্জন বনের পাতায় আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের শান্ত নীরবতায়। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের দীর্ঘ শ্বাস ছাপিয়ে এই জনপদ আজও অনন্য।
