
পরেশ দেবনাথ, বিশেষ প্রতিনিধি
কেশবপুরের ঐতিহ্যবাহী সাগরদাঁড়িতে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত আমলের একটি ঐতিহাসিক খাড়া অস্ত্র (বড় দা) উদ্ধার করা হয়েছে। যে অস্ত্র দিয়ে তৎকালীন জমিদাররা মহিষ/ছাগল বলি দেয়া হতো বলে জানা যায়। এই খাড়া অস্ত্রটির মাঝখানে দুই পাশে দুইটি চোখ আঁকানো রয়েছে যার মনি দুটো স্বর্ণ দিয়ে তৈরি। এটি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে ব্যবহৃত সমসাময়িক (২’শ থেকে আড়াই’শ বছরের) কালের একটি পুরোনো সামগ্রী। দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকার সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন প্রতিনিধি রাজ্জাক আহম্মেদ রাজু-এর তথ্য অনুযায়ী সাগরদাঁড়ি দাশপাড়া (ঋষিপাড়া) এলাকার বাসিন্দা মৃত বাসুদেব দাশের বাড়ি থেকে ঐতিহাসিক এই অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। অস্ত্রটি বর্তমানে এটি দর্শনার্থীদের দেখার ও গবেষণার জন্য সাগরদাঁড়ি এম. এম. দত্ত বাড়ি জাদুঘরে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।সাংবাদিক রাজ্জাক আহম্মেদ রাজু জানান, শুক্রবার (১৭ জুলাই-২৬) সকালে আকস্মিক ভাবে সাগরদাঁড়ি গ্রামের প্রতিবেশী (ঋষি পাড়ার) বাসুদেব দাশ মারা যাওয়ার খবর পেয়ে তাকে একনজর শেষ বারের মত দেখতে যাই। এক পর্যায়ে পাড়ার লোকদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে দত্ত বাড়ির খাড়া অস্ত্র (বড় দা)-এর কথা। এ কথা আমি শোনার পর ঐ পাড়ার বয়স্ক ব্যক্তি ও বাসুদেবের আপন কাকাতো ভাই অধীর দাশ (৬৭) কে প্রশ্ন করলাম, বাসুদেবের ঘরে ঐ ‘বড়ো দা’ খানা আসলো কি ভাবে?”তখন অধীর দাশ জানান, “আমার জ্যাঠা ঠাকুর দাশ ও আমার বাবা হরিপদ দাশ আপন দুই ভাই ছোট বেলা থেকে সাগরদাঁড়ি মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র উত্তরসূরী দত্ত বাবুদের বাড়িতে নিয়মিত কাজ করতেন। একটা সময় তারা ভারতে চলে যাওয়ার সময় মহিষ বলি দেয়ার ঐ (বড় দা) খানা আমার জ্যাঠা ও আমার বাবার নিকট দিয়ে চলে যান। সেই থেকে ঐ বড় দাটি আমার জ্যাঠার বাড়িতে, কখনও আমাদের বাড়িতে থাকতো। এর পর জ্যাঠার বড় ছেলে গোপাল দাসের বাড়িতে এবং গোপাল মারা গেলে সেই থেকে তার ছোট ভাই বাসুদেবের বাড়িতে ছিল এ দা। আজও আমরা যত্ন করে রেখেছি।”তথ্য সংগ্রহকারী সাংবাদিক রাজ্জাক আহম্মেদ রাজু তাদের বলেন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের পূর্ব পুরুষদের সম্পদ দত্ত বাড়িতে অথাৎ সাগরদাঁড়িস্হ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের মধুপল্লীর মিউজিয়ামে রাখার জন্য প্রস্তাব দিলে তিনিসহ ঐ পাড়ার সকলে একমত পোষণ করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকার প্রতিনিধি রাজ্জাক আহম্মেদ রাজু ওই ঐতিহাসিক “খাড়া অস্ত্র” (বড় দা) টির তথ্য উদঘাটন করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাগরদাঁড়ি মধুপল্লীর কাস্টোডিয়ান মোঃ হাসানুজ্জামান-এর নির্দেশনা অনুযায়ী মধুপল্লীর কম্পিউটার অপারেটর মোঃ হারুন অর রশিদ এবং দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত দলটি মৃত বাসুদেব দাশের বাড়ি থেকে ‘বড় দাটি’ উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেন।এ বিষয়ে সাগরদাঁড়ি মধুপল্লীর কাস্টোডিয়ান মোঃ হাসানুজ্জামান বলেন, “স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক ভাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নিয়ে একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই পুরাকালীন নিদর্শনটি উদ্ধার করি।প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর সমসাময়িক কালের একটি ঐতিহাসিক সামগ্রী। মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাচীন নিদর্শনটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। বড় দাটি বর্তমানে আমাদের হেফাজতে রয়েছে এবং এটি দর্শনার্থীদের দেখার ও গবেষণার জন্য সাগরদাঁড়ি এম. এম. দত্ত বাড়ি জাদুঘরে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি রক্ষায় যারা তথ্য ও সহযোগিতা করেছেন, তাদের ধন্যবাদ জানাই।”এদিকে মহাকবির আমলের এই প্রাচীন নিদর্শন উদ্ধারের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় উৎসুক জনতা ও কবি ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। প্রাচীন ও ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি একনজর দেখার জন্য অনেকেই মধুপল্লী এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন।
