
শচীন্দ্র নাথ মন্ডল দাকোপ খুলনা প্রতিনিধি ঃ
পশুর নদীর তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে খুলনার দাকোপ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাণীশান্তা যৌনপল্লী। মোংলা সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৪ সালে গড়ে ওঠা সরকারি নিবন্ধিত প্রায় সাত দশকের পুরোনো এই পল্লী এখন ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলীনের পথে। ইতোমধ্যে ভাঙনে বহু ঘরবাড়ি ও চলাচলের রাস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অনেক স্থাপনা।সরেজমিনে দেখা গেছে, পশুর নদীর অব্যাহত ভাঙনে পল্লীর সীমানা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। নদীতীরের বেশ কিছু ঘর কয়েক দফায় নদীগর্ভে চলে গেছে। অনেক ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে দেখা দিয়েছে ফাটল। বসতভিটা হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, একসময় এ পল্লীতে কয়েকশ নারী বসবাস করলেও নদীভাঙন ও স্থানান্তরের কারণে বর্তমানে বাসিন্দার সংখ্যা কমে প্রায় ১৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। ভাঙনে শুধু ঘরবাড়িই নয়, তাদের জীবিকা ও নিরাপদ বসবাসের জায়গাও হুমকির মুখে পড়েছে।পল্লীর ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী লাভলী বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে ঘর সরাতে সরাতে এখন আর পেছনে যাওয়ার জায়গা নেই। নদীতে ঘর ভেঙে গেলে কিছুটা পেছনে গিয়ে আবার ঘর তুলতে হয়। এভাবে আর কতদিন টিকে থাকা সম্ভব, জানি না।’তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নদী থেকে সরাসরি ঝড় এসে ঘরবাড়িতে আঘাত করে। চারপাশে লোনা পানি থাকায় পানীয় জলের জন্য দূর থেকে নৌকায় করে পানি আনতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এমন দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেই।পল্লীর বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন—নদীভাঙনে পুরো এলাকা বিলীন হলে তাদের আশ্রয় হবে কোথায়? পুনর্বাসনের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ভাঙন ঠেকানো নয়, পল্লীর বাসিন্দাদের নিরাপদ আবাসন, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার বিষয়টিও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।বাণীশান্তা যৌনপল্লীতে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের যাতায়াত নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগের কথা জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বয়সে কম এমন কিছু ছেলে প্রতিদিন পল্লী এলাকায় যাতায়াত করছে। এর ফলে কিশোরদের নিরাপত্তা ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারি এবং বয়স যাচাইসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।তবে এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, পল্লীর বাসিন্দাদের মানবিক সংকট ও নদীভাঙনের শোচনীয় অবস্থা তিনি সরেজমিনে দেখেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান বলেন, তিনি সম্প্রতি এখানে যোগ দিয়েছেন। খুব শিগগিরই স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তবে স্থানীয়দের দাবি তাৎক্ষণিকভাবে নদী ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগের পাশাপাশি বাণীশান্তা যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করতে হবে? তা নাহলেনদীভাঙন অব্যাহত থাকলে ঐতিহ্যবাহী এই পল্লীর বাসিন্দারা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
