
রাসেল আহমেদ,নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের ধারে অবহেলায় পড়ে থাকত হোগলাগাছ। মানুষের কাছে এর তেমন কোনো অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। অথচ সেই হোগলাপাতাই আজ খুলনার তেরখাদা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামের শত শত মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। গ্রামের কারিগরদের হাতে তৈরি হোগলাপাতার পাটি এখন স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে খুলনা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পৌঁছে যাচ্ছে। একটি সাধারণ কুটিরশিল্পকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত।তেরখাদা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে কর্মব্যস্ততার এক পরিচিত দৃশ্য। কারও উঠানে শুকানো হচ্ছে হোগলাপাতা, কোথাও চলছে পাটি বোনার কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে নারী-পুরুষ সমানতালে ব্যস্ত থাকেন এই শিল্পকে কেন্দ্র করে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা ঐতিহ্যবাহী এই পেশা আজ অনেক পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার অন্যতম ভিত্তি।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আনন্দনগর গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হোগলাপাতার পাটি উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে পাটি তৈরি করে তারা সংসারের আয় বাড়াচ্ছেন এবং পারিবারিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন।হোগলাপাতার পাটি ব্যবসায়ী হিরা মোল্লা বলেন, “এই গ্রামের অনেক পরিবার এখন হোগলাপাতার পাটির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন পাটি তৈরি ও বিক্রি করে সংসার চলে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন উৎপাদন বাড়াতে আমাদের দিন-রাত পরিশ্রম করতে হয়।”তিনি আরও বলেন, “আনন্দনগরে তৈরি পাটি তেরখাদার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও খুলনা ও যশোর শহরে নিয়মিত বিক্রি হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পাইকারদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও ভালো।”স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চার থেকে পাঁচ দশক ধরে আনন্দনগরে হোগলাপাতার পাটি তৈরির কাজ চলে আসছে। বর্তমানে গ্রামটিতে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি পাটি উৎপাদিত হয়। এসব পাটি বিক্রির মাধ্যমে বছরে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।পরিবেশকর্মী মাহমুদুল হাসান বলেন, “বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। হোগলাপাতার পাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা এখনও অনেক বেশি। এটি পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে।”স্থানীয়রা জানান, সবজি পরিবহন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন এবং দৈনন্দিন নানা কাজে হোগলাপাতার পাটির ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে বছরের এই সময়টিতে কারিগরদের ব্যস্ততাও থাকে সবচেয়ে বেশি।একসময় মূল্যহীন মনে করা হোগলাপাতাকে কেন্দ্র করে আজ গড়ে উঠেছে একটি সম্ভাবনাময় কুটিরশিল্প। হোগলাপাতা সংগ্রহ, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাটি তৈরি ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামের অসংখ্য মানুষের শ্রম ও দক্ষতা। ফলে এটি আর শুধু একটি কুটিরশিল্প নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন বাড়াতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।একসময় যে হোগলাপাতা ছিল অবহেলিত ও প্রায় মূল্যহীন, আজ সেটিই তেরখাদার আনন্দনগর গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার, মানুষের শ্রম ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প এখন গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্বাবলম্বিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আনন্দনগরের হোগলাপাতার পাটি তাই কেবল একটি পণ্য নয়, এটি একটি গ্রামের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প; যা আজ ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।
