
জি. এম. ফিরোজ, ডুমুরিয়া
সরকারি চাকরি যেন সোনার হরিণ—আর সেই হরিণ ধরিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ডুমুরিয়ায় একাধিক পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. গালিব হাসান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। এসআই, সিআইডি ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ বিভিন্ন সরকারি পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া, কথিত নিয়োগপত্র দেখানো এবং টাকা ফেরত চাইলে নানা হয়রানির অভিযোগে এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। তাঁদের দাবি, চাকরির আশায় সর্বস্ব দিয়ে এখন তাঁরা নিঃস্ব। একই সঙ্গে কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেছেন, গালিব ও তাঁর স্ত্রী শুধু টাকা নেননি; চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের যৌন হয়রানি ও দেহ ভোগ করেছেন। এসব গুরুতর অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় শাহপুর বাজার বণিক সমিতির দ্বিতীয় তলায় সাংবাদিকদের সামনে লিখিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা চাকরির নামে অর্থ লেনদেন, কথিত নিয়োগপত্র, যৌন হয়রানি ও অন্যান্য অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, আন্দুলিয়া গ্রামের সরদারবাড়ি এলাকার মো. গালিব হাসান, পিতা—আ. ছাত্তার মোল্লা, তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছেন। সব অভিযোগ মিলিয়ে অর্থের পরিমাণ প্রায় দুই কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।সবচেয়ে বড় অভিযোগটি এসেছে দেড়ুলী এলাকার আকরাম ফরাজীর পরিবারের কাছ থেকে। পরিবারের দাবি, তাঁর মেয়ে খৈরা খাতুনকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১৫ লাখ টাকা, ছোট মেয়ে জরনাব খাতুনকে সিআইডিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ এবং ছেলে রাকিব ফরাজীকে পুলিশের এসআই পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই পরিবারের কাছ থেকে মোট ৪৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাকিবকে একটি কথিত নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি।আন্দুলিয়া ফকিরবাড়ির এফ এম সাকিবের অভিযোগ, পুলিশে এসআই পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তাকেও একটি কথিত নিয়োগপত্র দেখানো হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।শাহপুরের আরও কয়েকটি পরিবারও একই ধরনের অভিযোগ করেছে। আ. কাদের গাজীর পরিবারের দাবি, তাঁর স্ত্রীকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পলিমা খাতুনের অভিযোগ, তাঁর ছেলেকে এসআই পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর স্বামীকে ট্রাক দিয়ে চাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং তাঁর দোকানে গিয়ে স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। এসব গুরুতর অভিযোগেরও স্বতন্ত্র তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।অন্যদিকে শাহপুর বাজারের ব্যবসায়ী মো. তালিম হোসেনের সঙ্গে গালিব হাসানের মোটরসাইকেল বন্ধক ও পরবর্তী বিরোধ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তালিমের দাবি, একটি FZ Version 150cc মোটরসাইকেল তাঁর কাছে ২ লাখ ৫ হাজার টাকায় বন্ধক রাখা হয়েছিল। পরে মোটরসাইকেল ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় বণিক সমিতিতেও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।এ ছাড়া শাহপুরের বিলকিস খাতুনের অভিযোগ, তাঁর নাবালিকা মেয়েকে পুলিশে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। হাসানপুরের কালাম মাস্টারের কাছ থেকেও চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।চাকরির নামে অর্থ লেনদেন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ—কোথায় গেল সেই টাকা?অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—চাকরির নামে এত বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগের পেছনে আসলে কী ঘটেছিল? কার মাধ্যমে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল? কথিত নিয়োগপত্রগুলো কোথা থেকে এলো? ব্যাংক, বিকাশ বা নগদ লেনদেনের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়ে থাকলে সেই অর্থের গতিপথ কী? আর এতগুলো পরিবারের সঙ্গে একই ধরনের অভিযোগের যোগসূত্রই বা কোথায়? পাশাপাশি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যৌন হয়রানি ও দেহ ভোগের যে অভিযোগ উঠেছে, তারও সত্যতা যাচাই জরুরি।ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁরা চাকরির আশায় জমি-সম্পত্তি বিক্রি, ধারদেনা ও সঞ্চয়ের টাকা তুলে দিয়েছেন। এখন চাকরিও হয়নি, টাকাও ফেরত পাননি। ফলে অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। কয়েকজন অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, চাকরির আশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করা হয়েছে এবং তাঁরা সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।প্রশাসনের কাছে ভুক্তভোগীদের ৬ দাবি ভুক্তভোগীরা অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কথিত নিয়োগপত্র যাচাই, অর্থ লেনদেনের উৎস ও হিসাব অনুসন্ধান, যৌন হয়রানি ও দেহ ভোগের অভিযোগ তদন্ত, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।তাঁদের ভাষ্য—“আমরা কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চাই না; আমরা চাই চাকরির নামে প্রতারণা ও হয়রানির প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।”
