
নিজস্ব প্রতিবেদক: সুন্দরবনের কাকড়া আহরণের সময় বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোল টিমের সদস্যদের গুলিতে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। সোমবার (১৮ মে) সকাল ৭টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের বাটলো এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। দুপুর দেড়টার দিতে আমিনুরের মরদেহ নিয়ে লোকালয়ে ফেরে তার সহকর্মীরা।নিহত আমিনুর রহমান গাজী সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের ৯নং সোরা গ্রামের মৃত আকছেদ গাজীর ছেলে।আমিনুরের সহকর্মী আহাম্মাদ আলী, সেলিম ও রমজানের বরাত দিয়ে স্থানীয়রা জানান, তারা চারজন গত ১৩ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে পাস নিয়ে কাকড়া আহরণে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। গতকাল রোববার রাতে তারা যখন ঘুমিয়ে পড়েন তখন তাদের নৌকা বাতাসের কারণে নদী পার হয়ে অভয়অরণ্য এলাকায় চলে যায়। সোমবার সকাল ৭টার দিকে সেখান থেকে ফেরার সময় বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের সদস্যরা তাদের আটক করে। এসময় নৌকা আটক রেখে তাদের বনের মধ্য রেখে যেতে চায় স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের সদস্যরা। এসময় জেলেরা নৌকা না দিয়ে চলে আসার সময় নলিয়ান স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোবারক তাদের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে আমিনুর রহমান গাজী গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আমিনুর রহমান গাজীকে কোন চিকিৎসা বা উদ্ধার না করে সেখানে ফেলে রেখে চলে যায় স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের সদস্যরা। পরে তার সাথে থাকা জেলেরা তাকে উদ্ধার করে ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়।বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, এ বিষয়ে তাদেরকে বন বিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের সদস্যরা এখনো কিছু জানায়নি। তবে আমারা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়েছি।গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে কাঁকড়া শিকারে যাওয়া জেলেদের উপর বনবিভাগের টহল টিমের সদস্যরা গুলি ছুঁড়েছে। সে ঘটনায় আমিনুর নামের এক জেলে নিহত হওয়ার পর স্থানীয় বনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বনজীবীরা সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালীনি স্টেশন ও তদসংলগ্ন রেঞ্জ কার্যালয় ঘেরাও করার জন্য সেখানে জড়ো হতে শুরু করেছে।তিনি অভিযোগ করেন, জলদস্যুরা গোটা সুন্দরবনজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও বনবিভাগ বা কোস্টগার্ড তাদের টিকিটি পর্যন্ত ছুঁতে পারছে না। অথচ নিরীহ জেলেদের উপর গুলি চালিয়ে লাখ লাখ বনজীবীর জন্য সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে ভীতি ছড়াচ্ছে।তিনি আরো বলেন, বিষয়টি ইউএনও, জেলা প্রশাসক ও ডিএফওকে জানানো হয়েছে। মরদেহ নিয়ে পরিবারটি এখন কি করবে, তা নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে।এবিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ মশিউর রহমান জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে দস্যু দমনে অভিযান চলছে। প্রকৃতপক্ষে কাদের গুলিতে ঐ জেলের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।জেলে নিহতের ঘটনাটি খুলনা রেঞ্জে ঘটেছে- জানিয়ে তিনি আরও বলেন, মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে টহল টিম পরিচালনার কথা জেলেদের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আমিনুর রহমানের নিহতের ঘটনার সাথে বনরক্ষী কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমান মিললে অবশ্যই প্রচলিত আইনের আওতায় আনা হবে তাকে।এদিকে বনরক্ষীদের গুলিতে জেলে আমিনুরের নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিকাল চারটার দিকে দুই শতাধিক বনজীবী দলবদ্ধ হয়ে বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ও পাশর্^বর্তী বুড়িগোয়ালীনি স্টেশন অফিসে হামলার চেষ্টা করে। কয়েক মিনিট ধরে ইট পাটকেল নিক্ষেপ ও সীমানা বেঁড়া ভাংচুরের পরপরই শামনগর থানা পুলিশ পরিস্থিতি দ্রæত নিয়ন্ত্রনে আনে।শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক জানান, গুলিতে এক বনজীবী নিহতের ঘটনায় উপকুলীয় এলাকায় বসবাসরত বনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে নিহত আমিনুরের মৃতদেহ এলাকায় পৌছেছে। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় নেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
