
নাজমুস সাকিব, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়:
নিরাপদ রক্ত নিশ্চিতকরণ, স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের উৎসাহ ও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। প্রতিবছর ১৪ জুন পালিত এই দিবসটি স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের সম্মান জানানো এবং রক্তদানে জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “One Drop of Humanity. Give Blood. Save Lives.” বাংলায় যার অর্থ, “প্রতি ফোঁটায় মানবতা, রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।” দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল, রক্তদান সংগঠন ও মানবিক প্রতিষ্ঠান রক্তদান ক্যাম্প, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং নতুন রক্তদাতা তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া, রক্তস্বল্পতা, প্রসূতির রক্তক্ষরণ, অগ্নিদগ্ধ রোগী, বড় ধরনের অস্ত্রোপচার ও সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তের কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রয়োজনের মুহূর্তে রক্তের চাহিদা পূরণে স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ১০ লাখ ইউনিটেরও বেশি রক্তের প্রয়োজন হয়। জনসংখ্যার তুলনায় এ চাহিদা খুব বেশি না হলেও এখনও দেশে স্বেচ্ছা রক্তদানে পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়নি। যদিও পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং স্বজনদের রক্তদানের হার বেড়েছে, তবুও প্রয়োজনীয় রক্তের ঘাটতি রয়ে গেছে।রক্তদানের জন্য প্রয়োজন কেবল একজন সুস্থ মানুষের আন্তরিক ইচ্ছা। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি প্রতি চার মাস অন্তর রক্তদান করতে পারেন। নিয়মিত রক্তদান শুধু রোগীর জীবনই বাঁচায় না, দাতার জন্যও বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উপকার বয়ে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রক্তদানে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমতে পারে। এছাড়া বিনামূল্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগও পাওয়া যায়।দেশে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, সন্ধানী, বাঁধন, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্তের চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি কিংবা করোনা মহামারির সময়ও হাজারো স্বেচ্ছা রক্তদাতা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে এসেছিলেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রক্তদাতাদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের আত্মতুষ্টি বা উদাসীনতা না আসে। কারণ রক্তের চাহিদা পূরণে এখনও অনেক পথ বাকি। জরুরি ফোনকলের অপেক্ষায় না থেকে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করা উচিত। এটিকে সামাজিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও রক্তদান অত্যন্ত মহৎ কাজ। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।” একইভাবে বাইবেল ও ঋগবেদেও মানবকল্যাণমূলক দানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জনগোষ্ঠীর অল্পসংখ্যক সক্ষম মানুষ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তাহলে রক্তের অভাবে কোনো মানুষের মৃত্যু হওয়ার কথা নয়। এক ব্যাগ রক্তের উপাদান পৃথক করে একাধিক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় রক্তদানের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান— রক্তের জন্য ফোনের অপেক্ষা নয়, নিজ উদ্যোগে নিয়মিত রক্তদানকে অভ্যাসে পরিণত করা। কারণ একটি ছোট্ট রক্তদানই ফিরিয়ে দিতে পারে একজন মুমূর্ষু মানুষের জীবন, একটি পরিবারের হাসি এবং মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
