
ডেস্ক :
তামিল সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক থালাপতি বিজয় এখন শুধু পর্দার নায়ক নন, তিনি হয়ে উঠেছেন বাস্তবের জননেতা। এবার তামিলনাড়ুতে ১০৯ আসনে এগিয়ে থালাপতি বিজয়ের টিভিকে। টানা তিন বার জয়ের পরে পিছিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন। ইতোমধ্যে বিজয়ের সমর্থকদের মধ্যে উল্লাস শুরু হয়ে গেছে। এগিয়ে থাকার এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিজয়ের দলই রাজ্যটিতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।গত ২৩ এপ্রিল তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮২ শতাংশেরও বেশি, যা রাজ্যের নির্বাচনী আগ্রহের প্রতিফলন। আজ সোমবার (৪ মে) কড়া নিরাপত্তায় চলছে ভোট গণনা।থালাপতি বিজয়ের গড়া রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ (টিভিকে)। এ দল গঠন করেই বিজয় সরাসরি রাজনীতির মাঠে নেমেছেন। ঘোষণা দেন নির্বাচনের। এমনকি দলের অভিষেকেই সরকার গঠনের আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন। তার ওই ঘোষণায় বিজেপিসহ বিরোধী দলের শিবিরে ঝড় বয়ে যায়।এবার থালাপতি বিজয় দুটি আসন থেকে নির্বাচন করছেন, পেরাম্বুর এবং তিরুচিরাপল্লি (পূর্ব)। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ের দল টিভিকে চমক দেখানোর পথে আছে।জন্ম ও বেড়ে ওঠা থালাপতি বিজয়ের আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। ১৯৭৪ সালের ২২ জুন তামিলনাড়ুর মাদ্রাজে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত কর্মজীবনে তিনি ৬৯টি চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম তিনি।তার বাবা এসএ চন্দ্রশেখর চলচ্চিত্র পরিচালক এবং তার মা শোভা চন্দ্রশেখর প্লেব্যাক গায়িকা এবং কণ্ঠশিল্পী হিসেবেসুনাম কুড়িয়েছেন। বিজয় প্রথমে কোডামবাক্কামের ফাতিমা স্কুলে এবং পরে ভিরুগামবাক্কামের বালালোক স্কুলে তার স্কুলজীবন সম্পন্ন করেন । তিনি লয়োলা কলেজ থেকে ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে চেয়েছিলেন , কিন্তু অভিনয় জীবনে মনোযোগ দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি পড়াশোনা ছেড়ে দেন।চলচ্চিত্র জীবনবিজয় ১৯৮৪ সালে পিএস বীরাপ্পা প্রযোজিত তামিল চলচ্চিত্র ভেত্রিতে শিশু অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন । তারপরে তিনি কুডুম্বাম, নান সিগাপ্পু মানিথান, বসন্ত রাগম, এনগেলা নেহাত্তু, এনগেলা নেহাত্তম চলচ্চিত্রে শিশু অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন। তার বাবা এস এ চন্দ্রশেখরের পরিচালিত সিনেমাতেও তিনি অভিনয় করেন ।১৯৯২ সালে ১৮ বছর বয়সে বিজয় প্রথমবারের মতো ‘নালাইয়া থীরপু’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয় এবং বিজয় তার চেহারা ও অভিনয়ের জন্য তীব্র সমালোচনার শিকার হন, কিন্তু তিনি দমে যাননি।১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে রোমান্টিক কমেডি চলচ্চিত্র ‘কোয়েম্বাটোর মাপ্পিলাই’ বক্স অফিসে হিট হয়েছিল। এরপর আসে বিক্রমণ পরিচালিত ‘পুভে উনাক্কাগা’। এ দুই চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে বিজয়কে ভামশী পাইদিপল্লি পরিচালিত অ্যাকশন ড্রামা চলচ্চিত্র ‘ভারিসু’ -তে দেখা যায় । চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছিল, বক্স অফিসে ৩০০ কোটি রুপিরও বেশি আয় করে। ২০২৩ সালে তার পরবর্তী মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল অ্যাকশন থ্রিলার ‘লিও’ । এটি সমালোচকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সফল একটি চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে এবং ৬০০ কোটি রুপিরও বেশি আয় করে সেই বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়।রাজনীতিতে অংশগ্রহণ২০০৯ সালে বিজয় তার ফ্যান ক্লাব বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম চালু করেন । সংগঠনটি ২০১১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন করেছিল । ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পাস করা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯-এর বিরুদ্ধে তার মতামত প্রকাশ করে বলেন, এটি দেশের সামাজিক-ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করবে।তার ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা ২০২২ সালের তামিলনাড়ু স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১১৫টি আসনে জয়লাভ করেন। ২০২৪ সালে বিজয় তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল চালুর ঘোষণা দেন ।২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কারুরে বিজয়ের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভিড়ের চাপে ৪১ জন নিহত হন । তিনি এই মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন এবং পরে মৃতদের নিকটাত্মীয় ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘোষণা দেন।চলতি বছর পুরোদমে রাজনীতিতে প্রবেশের পর জাতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া তার প্রথম সাক্ষাৎকারে বিজয় বলেন, তার আদর্শদের মধ্যে রয়েছেন এম জি রামচন্দ্রন, জে জয়ললিতা এবং এম করুণানিধি ।কেন হঠাৎ রাজনীতিতে?অনেকে ভাবছেন, সিনেমায় এত সফল একজন তারকা কেন হঠাৎ রাজনীতিতে এলেন? বিজয়ের ভাষায়, ‘রাজনীতি সিনেমার মতো অভিনয়ের জায়গা নয়, এটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই আমি এসেছি।’বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছে সফল চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার থেকে। তবে তার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। যেমন ২০২৫ সালের কারুর স্ট্যাম্পিড-সংক্রান্ত তদন্ত। তবুও তিনি কোনো জোটে না গিয়ে একাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ‘আদর্শগত শত্রু’ ও ডিএমকেকে ‘রাজনৈতিক শত্রু’ বলেছেন।তার মতে, রাজনীতি কোনো পেশা নয়, এটা জনসেবা। এই সাহসী অবস্থান ও সরাসরি কথাগুলো মুগ্ধ করেছে শুধু ভারতের মানুষকেই নয়, বাংলাদেশের ভক্তরাও ব্যাপকভাবে প্রশংসা করেছেন বিজয়ের।
