
ডেক্স:
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান নিয়ে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। চৈত্র মাসের অকাল ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জলাবদ্ধতায় উপজেলার প্রায় সব হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ভেঙে গেছে হাজারো বোরো চাষির স্বপ্ন। যেসব জমির ধান এখনো টিকে আছে, সেগুলোরও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভ-লোকসানের হিসাবে কোথায় দাঁড়ায়, তা বুঝতে সর্বশেষ ধান ও চালের সরকারি দাম নির্ধারণের প্রতীক্ষায় ছিলেন বোরো চাষিরা। গত বুধবার সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকের ধান ও চাল কেনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। যা রীতিমতো হতাশ করেছে বোরো চাষিদের। এ ছাড়া হাওরের বেশিরভাগ রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। এতে পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।মধ্যনগর উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, এ বছর ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৪৯ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল কিনবে সরকার। এ ছাড়া আতপ চাল কেনা হবে ৪৮ টাকা কেজি দরে। গত বছরও কৃষকের ধান ও চাল কেনার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে এ একই দর নির্ধারণ করা হয়েছিল। এমন অবস্থায় কৃষকরা বলেছেন, জলাবদ্ধতায় ফসলহানি আর ধান সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা সরকারের আগের বাজার দরে ধান ও চাল কেনার সিদ্ধান্তে বেকায়দায় পড়বেন তারা। এর মাঝে ফড়িয়া আর চাতাল মালিকদের কারসাজিতে এবার নিঃস্ব হতে হবে তাদের।চলতি মৌসুমে উপজেলার ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করেছেন এখানকার চাষিরা। কৃষি দপ্তরের সূত্র বলছে, এরই মধ্যে উপজেলার অন্তত ২৫০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে চৈত্রের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে টগার হাওরে। এ হাওরে দুই হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮০ হেক্টরেরও বেশি জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত উপজেলায় ৪ হাজার ৮৫৩ হেক্টর অর্থাৎ ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। যা গত মৌসুমের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। জলাবদ্ধতায় অনেক জায়গায় ধান তলিয়ে গেছে। এ কারণে হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া কৃষি শ্রমিকের সংকট থাকায় ধান কাটায় গতি আসছে না।এদিকে ভেজা ধান সংগ্রহে না রেখে শ্রমিকের মজুরি ও ঋণ পরিশোধের তাগিদে কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অন্যদিকে, হাওর থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত ধান পরিবহনের উপযুক্ত সড়ক এবং নৌপথে ধান-চাল পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় হাওরে রেখেই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন অনেক কৃষক। যেখানে সরকারি দামে মণপ্রতি তাদের ১ হাজার ৪০০ টাকার বেশি পাওয়ার কথা।মধ্যনগর বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিউড়া গ্রামের কৃষক বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, ‘যারা বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন, তাদের প্রতি বিঘা জমিতে ১ থেকে ২ হাজার টাকা লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে কৃষকদের ঠকাচ্ছে।’পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ধান চাষ করে তেমন লাভবান হতে পারছেন না। সরকার যখন ধান চাল কেনে, তখন দরিদ্র কৃষকরা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। সরকারি এসব কর্মসূচিতে বরং মিল মালিক ও মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। কৃষকরা যদি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারে তবে তারা উপকৃত হবেন।’এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক সমস্যা—দুর্বল সড়ক ব্যবস্থা। হাওরের ভেতর থেকে ধান কেটে খলায় আনার সময় ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তার কারণে পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব সড়ক কাদায় পরিণত হয়, ফলে ট্রলি বা পিকআপ চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ধানবোঝাই যানবাহন রাস্তায় আটকে থেকে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।উপজেলার শালধিঘা হাওরের কৃষক রাবিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাঁচা রাস্তার কারণে প্রতি ধান আনতে অতিরিক্ত ৩০-৪০ টাকা খরচ হচ্ছে। বাইনসাপড়া হাওরের কৃষক সাগর সরকার জানান, উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিক সংকট মিলিয়ে ধান চাষ এখন আর লাভজনক থাকছে না।স্থানীয়দের দাবি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং টেকসই সড়ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাওরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আশয়াদ বিন খলিল রাহাত বলেন, চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে টেকসই সড়ক অবকাঠামোর অভাবে কৃষকদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং দুর্ভোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, হাওরাঞ্চলের সড়কগুলো উন্নত ও পাকা করা গেলে কৃষকরা সহজে ও দ্রুত ধান পরিবহন করতে পারবেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা করা হয়েছে।
