
ক্রাইম রিপোর্টার, খুলনা:
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নে মিন্টুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমানে চাঁদখালী সন্ত্রাসীদের কার্যত একটি ‘সেভ জোনে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে বিচরণ করছে।
চাঁদখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাদা আবু ইলিয়াসের ভাষ্যমতে, ৫ আগস্টের আগে মিন্টু ছিল একজন টাউট ও প্রতারক। সে বিভিন্ন শোরুম থেকে কিস্তিতে ফ্রিজ কিনে কম দামে বিক্রি করে আত্মগোপনে চলে যেত। তার বিরুদ্ধে একাধিক ফ্রিজের মামলা রয়েছে।
মিন্টুর চাচাত ভাই মনিরুল ওরফে ‘ঘোড়া মনিরুল’ পুলিশের দালাল হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের অভিযানের খবর আগেভাগে জানিয়ে মিন্টুকে পালাতে সহায়তা করত সে।
বিএনপির ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীদের উত্থান:
৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই মিন্টু বিএনপির ছত্রছায়ায় চাঁদখালীর প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঢাকা ও খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং অস্ত্র মামলার আসামিদের একত্র করে সে একটি গুন্ডা বাহিনী গড়ে তোলে। এরপর শুরু হয় চাঁদাবাজি ও লুটপাট।
৫ আগস্ট রাতে সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাদা আবু ইলিয়াসকে ফোনে হত্যার হুমকি দিয়ে তার সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার হুমকি এবং ইটভাটা থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে চেয়ারম্যান দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। যেটির কল রেকর্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
৬ আগস্ট সাবেক সেনাসদস্য রজব আলীর দোকান দখল করে তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের জেরে মামলা ও হয়রানি:
৭ আগস্ট চেয়ারম্যানের ভাই জুলফিকার আলী (ভুট্টো) বিএনপির মহাসচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে অস্ত্রধারী কুদ্দুস মোড়লের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ ছিল।
অভিযোগের পর ভুট্টোকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। জামিনে মুক্তির পর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে মুচলেখা ও হলফনামা আদায় করা হয়।
৮ আগস্ট থেকে শুরু হয় তথাকথিত ‘মামলা বাণিজ্য’। মাদক ব্যবসায়ী রুবেলকে বাদী করে প্রায় ৩৪০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
সহিংসতা ও গণপ্রতিবাদ:
২১ আগস্ট মোল্লা ইউনুসের ঘের দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে তাকে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরদিন মিন্টু বাহিনীর বিরুদ্ধে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও জুতা মিছিল করে।
২৩ আগস্ট জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে এ কর্মসূচির সংবাদ প্রকাশিত হয়। মানববন্ধনে নির্যাতিত পরিবারসহ শত শত মানুষ অংশ নেন।
পিচ্চি ইব্রাহিমের আগমন:
পরবর্তীতে মিন্টু তার শক্তি বাড়াতে ঢাকার সরওয়ার্দী এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি ইব্রাহিমকে এলাকায় নিয়ে আসে। এর ফলে চাঁদখালীর ব্যবসায়ী, ইটভাটা ও অবৈধ কয়লা চুল্লির মালিকদের থেকে চাঁদা ও নিজে জায়গা দখল করে কয়লার চুল্লির ব্যবসা শুরু করে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন,
“জুয়াখোর ও চিটার মিন্টু এখন বড় নেতা। ওর সাথে সবসময় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা থাকে। এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মিন্টুর সঙ্গে থানার কিছু কর্মকর্তার সখ্যতা রয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানের আগেই তাকে সতর্ক করা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। তথ্যদাতাদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর অভিযানে একটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হলেও কাউকে আটক করা যায়নি।
নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ:
হঠাৎ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঁদখালীতে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত মিন্টু বাহিনীকে গ্রেপ্তার করা না গেলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
