
নাজমুস সাকিব, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী আজ এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটের মুখোমুখি। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন, সামাজিকমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, সামাজিক চাপ এবং অপর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা—সব মিলিয়ে তরুণদের মানসিক সুস্থতা বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ১৬.৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এ হার ১৩.৬ শতাংশ। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪.৫ শতাংশ কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পান না। জরিপটি পরিচালনা করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ) এবং কারিগরি সহায়তা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন, অনলাইন গেম এবং সামাজিকমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই হীনম্মন্যতা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে গেমিং ও ডিজিটাল আসক্তির কারণে আচরণগত পরিবর্তন, আগ্রাসী মনোভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রবণতাও বাড়ছে।অন্যদিকে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব মানসিক চাপের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক সংকট বহু তরুণকে হতাশা ও উদ্বেগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে কাঠামোগত অর্থনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সাত লাখ মানুষের জন্য গড়ে একজনেরও কম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অপ্রাপ্য। দেশে বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতালও হাতে গোনা কয়েকটি।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক ট্যাবু দূর করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা, তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ও জনবল বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। অন্যথায় দেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটের চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
