
ডেস্ক :
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ৫ মে দুপুরে দ্বিপক্ষীয় সফরের উদ্দেশ্যে চীনের বেইজিং যাচ্ছেন বলে কালবেলাকে নিশ্চিত করেছে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের এক নির্ভরযোগ্য সূত্র। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের আমন্ত্রণে এই সফরে তার সঙ্গে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ছমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান।দূতাবাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র কালবেলাকে জানায়, আগামী ৬ মে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আসন্ন বৈঠক মূলত ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ।এ সফরে কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে না; বরং দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবস্থা পর্যালোচনা করবে এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতা আরও গভীর করার পথ খুঁজবে। সূত্রটি বলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে বিগত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে নিশ্চয়তা চাইবে চীন। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, তা এগিয়ে নিতে এ দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ রয়েছে দেশটির। এ ছাড়া তিস্তা চুক্তি, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, বহুপক্ষীয় ফোরামে সমন্বয়, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে।দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যেসব ইস্যু উত্থাপন করবে ঢাকা:বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাধায় যেন দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। ফলে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বহুমুখী ইস্যু উত্থাপন করা হবে।দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পর্যালোচনা ও উচ্চপর্যায়ের সফর (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর) নিয়ে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে নানা কারণে যেহেতু চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কমছে, ফলে বাংলাদেশ চীনের কাছে স্পষ্টভাবে বার্তা দেবে যে, নতুন সরকার চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়াতে চায়। বিশেষ করে গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও শিল্পায়ন খাতে চীন আরও বিনিয়োগ করুক-এমন প্রত্যাশা করা হবে। ঢাকার পক্ষ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিআরআই প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।বাংলাদেশ চায় চীনের সঙ্গে যেসব প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, তা দ্রুত শেষ হোক এবং ভবিষ্যতে যেন ঋণের শর্ত আরও সহজ হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং নীলফামারীতে প্রস্তাবিত চীনের বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, চীনা কোম্পানিগুলোকে গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স ও নতুন জ্বালানি খাতে আকৃষ্ট করা, বাংলাদেশ থেকে চীনে আরও কৃষিপণ্য রপ্তানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, পশুসম্পদ, মৎস্য, রেলওয়ে, শিপিং, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আইটি ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতা,আকাশ, স্থল ও সমুদ্রগণে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও তিস্তা প্রকল্পে চীনা সহযোগিতা চাওয়া বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।এ ছাড়া জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্সির জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় চীনের সমর্থন চাইবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ব্রিকস, আরসিইপি ও এসসিও-তে যোগদানে সহায়তা এবং সার্কের আওতায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনার কথা রয়েছে। বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) প্রত্যাবাসনবাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। চীন মিয়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখায়, চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার বিষয়টিও উত্থাপন করবে ঢাকা।দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে চীনের এজেন্ডা:ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় চীন। ফলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক প্রভাবঅর্থনৈতিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোকে কেন্দ্র করে এ বৈঠকে চীন তাদের এজেন্ডা সাজাচ্ছে।চীনা দূতাবাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিএনপি সরকারের কাছে চীনের এজেন্ডায় রাজনৈতিক আস্থা জোরদার করা, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়ানো এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করার বিষয়টিও প্রাধান্য পাবে।দূতাবাসের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখি। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা হস্তক্ষেপ করি না। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সফরে বাংলাদেশ যদি চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো দিকে জোর দেয়, তাহলে বিনিয়োগের নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি সিদ্ধান্তও পরিবর্তন হয়, তাহলে চীনা কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না।নির্ভরযোগ্য সূত্রটি বলছে, তিস্তা মাস্টার প্ল্যান এবং অন্যান্য বিআরআই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, পাশাপাশি শিল্প স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী চীন। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, কৃষি ও শিল্পপণ্য আমদানি বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করতে চায় চীন।
