
ডেস্ক :
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসলামাবাদ আলোচনায় দৃশ্যমান ফল না আসার পর রাশিয়া সফরে গেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বিশেষ বার্তা নিয়ে তিনি মস্কো যান। গতকাল সোমবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা। বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইরানকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে মস্কো প্রস্তুত। এর আগে ইসলামাবাদ আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন আরাগচি। পাশাপাশি ইরানের নেতারা সম্ভাব্য ফের হামলার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে।গতকাল আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে এই শান্তি যত দ্রুত সম্ভব অর্জিত হয়, তা নিশ্চিত করতে আমরা আপনাদের স্বার্থ এবং এই অঞ্চলের সব মানুষের স্বার্থে সম্ভাব্য সবকিছু করব।’পুতিন আরও বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি, এই সাহস ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে ইরানের জনগণ বর্তমান সংকটকাল অতিক্রম করবে এবং শান্তি ফিরে আসবে।’রাশিয়ার সমর্থনের জন্য মস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে আব্বাস আরাগচি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবে। সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রমাণিত হয়েছে যে, ইরানের জনগণ তাদের প্রতিরোধ ও সাহসের মাধ্যমে মার্কিন হামলা ও আগ্রাসন প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এই কঠিন সময়ও তারা টিকে থাকতে পারবে।বৈঠকের শুরুতে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অবসানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে তার। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে রাশিয়ার পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, প্রেসিডেন্টের সহকারী ইউরি উশাকভ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান ইগর কস্তিউকভ (অধিদপ্তর প্রধান)। অন্যদিকে, ইরানি প্রতিনিধিদলে আরাগচি ছাড়াও ছিলেন তার ডেপুটি কাজেম গরিব-আবাদি এবং মস্কোতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি।এই বৈঠকে খামেনির বার্তা পুতিনের কাছে পৌঁছে দেন আরাগচি। রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তি রয়েছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকেই মস্কো ও তেহরান সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। তবে ওই বিশেষ বার্তা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো যায়নি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে চলমান আলোচনার বর্তমান পরিস্থিতিই হবে এই বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু।ক্রেমলিন জানিয়েছে, তারা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে এই সংঘাত নিরসনে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ইরানে অস্ত্র সরবরাহের দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, রাশিয়া ইরানকে ড্রোন সরবরাহে রাজি হয়েছে। এমনকি মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।একটি হামলার জবাব হবে চার গুণ, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের হুমকি: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো যাতে ওয়াশিংটনকে সমর্থন না দেয়, সেজন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।তেহরান জানিয়েছে, তাদের তেলকূপসহ কোনো অবকাঠামো হামলার নিশানা হলে হামলাকারীদের সমর্থক উপসাগরীয় দেশগুলোতে ‘চারগুণ’ পাল্টা আঘাত হানা হবে। হরমুজ প্রণালিতে চলমান নৌ-অবরোধের মধ্যে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে এই হুমকি দেন।তিনি বলেন, ‘যে কোনো ধরনের আগ্রাসী আচরণের জবাব দেওয়া হবে। অবরোধের কারণে আমাদের তেলকূপসহ কোনো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আগ্রাসনকারীকে সমর্থন দেওয়া দেশগুলোতে একই পরিকাঠামোয় চারগুণ হামলা চালিয়ে আমরা সমপরিমাণ ক্ষতি নিশ্চিত করব।’ইসফাহানি আরও বলেন, ‘আমাদের অঙ্ক কষার পদ্ধতি আলাদা। যদি আমাদের একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়, আমরা চারটি তেল শোধনাগারে হামলা চালাব।’তেহরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘কার্ড’ আছে, হুঁশিয়ারি বাঘের গালিবাফের: ওয়াশিংটন ও তেহরানের অর্থনৈতিক ‘কার্ড’ বিশ্লেষণ করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের আধিপত্যের দাবি তিনি নাকচ করেছেন। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তির বড় অংশই এরই মধ্যে হারিয়েছে। অন্যদিকে, তেহরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ‘কার্ড’ রয়েছে, যা ব্যবহার করা হয়নি। রোববার রাতে নিজের এক্সে(সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে গালিবাফ এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার একটি সমীকরণ তুলে ধরেন। এর একদিকে রয়েছে ইরানের সরবরাহভিত্তিক সক্ষমতা—হরমুজ প্রণালি, বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও তেলের পাইপলাইন।যুক্তরাষ্ট্রের কারণে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী: পাকিস্তানের ইসলামাবাদে তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন আরাগচি। সোমবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর পর ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক এ মন্তব্য করেন। আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও অতিরিক্ত দাবির কারণে অগ্রগতি সত্ত্বেও আগের দফার আলোচনা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে পাকিস্তানের কাছে ‘রেড লাইন’ তালিকা দিল ইরান: ইরান তার ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখার একটি তালিকা পাকিস্তানকে দিয়েছে, যাতে ইসলামাবাদ তা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
