
সোহেল রানা,স্টাফ রিপোর্টার :
রাজশাহীর তানোর উপজেলা উত্তর বঙ্গের অন্যতম বৃহৎ আলু উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রতি বছর আলু মৌসুম এলেই এখানকার কৃষকদের সবচেয়ে বড় ভরসাহীনতার জায়গা হয়ে দাঁড়ায় সার। সরকারি নির্ধারিত দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চড়া দামের সার কিনতেই বাধ্য হচ্ছেন তারা। ফলে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্যে নাজেহাল হয়ে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, ডিলার ও ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। অথচ কৃষি দপ্তর বছরের পর বছর নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবেও সার বরাদ্দ বণ্টনের অভিযোগ আছে।তানোর পৌর এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক গত আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অফিসে অপেক্ষা করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে ফিরে যান। মালেক বলেন,“সারই তো পাচ্ছি না, অভিযোগ করবো কার কাছে?”তালন্দ এলাকার কৃষক ইমরুল হকও একই সমস্যার কথা জানান। তিনি জানান,
“১৫–১৬ বিঘা জমিতে আলু চাষ করব। অথচ কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অফিসারের কাছে এসেছি, কোনো সমাধান মেলে কি না। গোল্লাপাড়া বাজারে কৃঞ্চপুর এলাকার কৃষক তারিকুল বলেন,ডিলার-ব্যবসায়ীরা সার নাই বলে ফিরিয়ে দেয়, আবার গোপনে বেশি দামে সার বিক্রি করে। প্রতি মৌসুমেই একই কাহিনি।”কলমা ইউনিয়নের এক কৃষক নাম প্রকাশ না করে জানান, তিনি বাড়তি দামে ১৮০০ বস্তা সার কিনেছেন—টিএসপি ১৪০০ টাকার পরিবর্তে ১৮০০ টাকা, ডিএপি ১০৫০ টাকার পরিবর্তে ১৪০০–১৪৫০ টাকা, পটাশ ১১০০ টাকার পরিবর্তে ১১৫০ টাকা। তিনি বলেন,তালন্দ বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়েছি। বাড়তি দাম ছাড়া চাহিদামতো সার মিলবে না—এটা এখন ওপেন সিক্রেট। চাষিদের ভাষ্য, পার্শ্ববর্তী মান্দা, মোহনপুর, নাচোল, নিয়ামতপুর, গোদাগাড়ীসহ নানা এলাকা থেকে চোরাই পথে সার এনে বেশি দামে বিক্রি করছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। এতে কৃষকরা ন্যায্য দামের সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আর ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া লাভের জোয়ারে ভাসছেন। এক কৃষকের ভাষায়,“সরকারি দামের সার নিতে গেলে ডিলারের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন। সামান্য কিছু পায় কেউ, আবার কেউ শূন্য হাতে ফিরে যায়। সাজ্জাদ নামে আরেক কৃষক জানান, গত বছর ৮ বিঘা আলু করে ৭-৮ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এবার ৩ বিঘায় চাষ করব, কিন্তু সরকারি দামে সারই মিলছে না। বাড়তি দাম দিলেই পাওয়া যাচ্ছে। বিএডিসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি আব্দুল মতিন বলেন, “কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ একেবারেই কম। তাই অনেকে বাইরে থেকে বেশি দামে এনে বেশি দামে বিক্রি করছে।”পাঁচন্দর ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলার প্রনব সাহা – খুলনার সময়ের খবর পত্রিকা কে..জানান , যতটুকু বরাদ্দ পাই, তা সরকারি দামে দেই। তবে অনেকে বহির থেকে সার এনে বাড়তি দামে বিক্রি করছে—এটা শুধু তানোরে নয়, আলু উৎপাদন এলাকা মানেই সার সংকট।উপজেলা কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,বাহির থেকে সার আসছে, বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে—সবাই জানি। কিন্তু কিছুই করার নেই। অভিযান দিলে চাষিরাই উত্তেজিত হয়ে অফিস পুড়িয়ে দিতে পারে। ব্যবসায়ীদের জরিমানা করলে তারা আর সার আনবে না—চাষও হবে না।”তিনি আরও জানান, “সরকার যদি আলু এলাকার জন্য আলাদা করে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিত, সংকট কেটে যেত। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। অতিরিক্ত কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুভাষ কুমার মন্ডল জানান, “তানোরে কৃষকরা জৈব সার খুব কম ব্যবহার করে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। বরাদ্দ খুবই সীমিত—সরকারি নিয়মের বাহিরে সার পাওয়া সম্ভব নয়। ডিসেম্বরের জন্য বরাদ্দ—টিএসপি: ২৯০ মে. টন ডিএপি: ১০৯০ মে. টনপটাশ: ৭০০ মে. টন ইউরিয়া: ১৪৫৯ মে. টনকর্তৃপক্ষের মতে, এ বরাদ্দ দু-চারজন বড় প্রজেক্ট চাষির প্রয়োজনেই শেষ হয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে তানোরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর—যা গতবারের তুলনায় ১২০০ হেক্টর কম। প্রান্তিক কৃষকদের দাবি— ন্যায্য দামে সার নিশ্চিত করা বরাদ্দ বাড়ানোসিন্ডিকেট প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি বাড়তি দামে বিক্রিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নইলে আগামী মৌসুমে আলু আবাদ আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
