খুলনা, বাংলাদেশ | ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১২ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Breaking News

  খর্নিয়া ইউপি নির্বাচন ঘিরে সরগরম রাজনৈতিক অঙ্গন, তৃণমূলের আলোচনায় বিএনপি নেতা শেখ শাহিনুর রহমান
  দাকোপে ৩ দিনের ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জনজীবন।
  ডুমুরিয়ার খর্নিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় বি এনপি নেতা আবুল কাশেম
  ‎ডুমুরিয়ায় ভদ্রানদী খননের মাটি বিক্রি সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয়, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বিদ্ধ জনগণ
  উখিয়ায় ইয়াবাসহ ৪ ভাই-বোন আটক
  দাকোপ উপজেলা নবগঠিত যাত্রা শিল্পী পরিষদের পরিচিতি সভা
  ডুমুরিয়ায় সরকারি রাস্তা দখল করে ভাড়াটিয়া দোকানদারদের পসরা: চরম ভোগান্তিতে চালক ও সাধারণ মানুষ
  তেরখাদায় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শনে এমপি হেলাল, আবনালী বিলে পোনা অবমুক্ত
  খুলনায় ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ আরেকটি ‘অনিবার্য বিপ্লবের’ প্রস্তুতি নিন —–ডা. শফিকুর রহমান
  আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের পাশে সরকার, ডুমুরিয়ায় জিআর চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ

ডুমুরিয়ায় খাল খননে হরিলুট: পানি না সরিয়েই ভেকু দিয়ে কাদা উত্তোলন, ‘রক্ষকই যখন ভক্ষক’

[ccfic]

ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি:

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিখালী ও বিলডাকাতিয়ার নিমতলা খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খালের পানি অপসারণ না করেই ভাসমান এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে নামমাত্র কাদা উত্তোলন করে বরাদ্দের টাকা হরিলুট করা হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও মাঠপর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই অনিয়ম ও লুটেরা সিন্ডিকেটের শীর্ষে খোদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সবিতা সরকার জড়িত রয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।প্রকল্পের বিবরণ ও কোটি টাকার বরাদ্দ উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘জলাবদ্ধতা’ নিরসনের লক্ষ্যে তেলিখালী ও বিলডাকাতিয়ার নিমতলা খাল দুটি পুনঃখননের মহতী উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই মেগা প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৩ টাকা। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, স্থানীয় অতিদরিদ্র ও বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে (শ্রমিক দিয়ে) এবং খালের পানি নিষ্কাশন করে খননকাজ করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কোনোটিই মানা হচ্ছে না।দুর্নীতির মূল চিত্র: যেভাবে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি পানি না সরিয়েই কাদা উত্তোলন সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, খালের বিভিন্ন অংশে এখনও ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত পানি জমে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সেচ পাম্প দিয়ে এই পানি অপসারণ করে তবেই মাটি কাটার কথা। কিন্তু সিন্ডিকেটটি সেই শ্রম ও খরচ বাঁচাতে অবলীলায় ভাসমান এক্সকাভেটর বা ভেকু মেশিন ব্যবহার করছে। পানির নিচ থেকে শুধু পেড়ি মাটি (কাদা) তুলে খালের পাড়েই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ— সামান্য বৃষ্টি হলেই এই কাদা ধুয়ে আবার খালের ভেতরেই পড়ে যাচ্ছে। ফলে খালের গভীরতা বাড়ছে না, উল্টো সরকারের কোটি কোটি টাকার মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাচ্ছে।শ্রমিকদের অনুপস্থিতি ও ভুয়া এনআইডি তালিকা সরকারি নির্দেশনায় দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকল্প এলাকায় কোনো শ্রমিকের দেখা মেলেনি। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, প্রকল্প শুরু করার আগে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বহু দরিদ্র মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ফটোকপি সংগ্রহ করেছিল সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের কাউকে কাজে নেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, এই এনআইডিগুলো ব্যবহার করে মাস্টাররোলে ভুয়া শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা চালাচ্ছে এই সিন্ডিকেট।কাগুজে বাঘ ও বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দপ্তরে কাগুজে প্রতিবেদন জমা দিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, প্রকল্পের ৭১ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এলাকাবাসী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে কাজের মাত্র ৫০ ভাগও শেষ করা হয়নি। বাকি টাকা স্রেফ ভুয়া কাগজপত্রের আড়ালে পকেটস্থ করা হচ্ছে।”সমাজে ঘর বাঁধছি, আর এখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি” — ক্ষুব্ধ কাজী সমাজ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এই বিশাল লুটপাটের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ডুমুরিয়া উপজেলার কাজী (নিকাহ ও বিবাহ রেজিষ্ট্রার) মাওলানা মো. আব্দুর রহমান।তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সমাজে প্রতিদিন কত মানুষের ঘর বাঁধছি, কত মানুষের সামাজিক বন্ধন তৈরি করছি। কিন্তু সমাজের এই রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি আজ সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। সরকারি নির্দেশ ছিল দরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের, অথচ মানুষের আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়ে ভুয়া নাম দিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে—এটা চরম অন্যায় ও পাপ। আমরা মাঠে গিয়ে দেখছি পানি না সরিয়েই কাদা তোলা হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সব ধুয়ে আবার খালেই যাচ্ছে। এই হরিলুটের কারণে ডুমুরিয়ার লাখ লাখ মানুষ আবারও তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতার মুখে পড়বে। আমরা এই জঘন্য দুর্নীতির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই এবং পর্দার আড়ালের মূল অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা ​সরকারি অর্থ এভাবে লোপাট ও দায়সারাভাবে খননকাজ চলায় ডুমুরিয়ার সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এই হরিলুটের কারণে ডুমুরিয়া উপজেলার কয়েক লাখ মানুষকে আবারও তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতার অভিশাপ মাথা পেতে নিতে হবে। এর ফলে সরকারের বিশেষ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দায় এড়ানোর চেষ্টা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোঃ রফিকুল ইসলাম: তিনি যান্ত্রিক মাধ্যমে কাজ করার কথা স্বীকার করে বলেন, “ভেকু দিয়ে কাজ করার জন্য ইতিমধ্যে আংশিকভাবে ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।” এছাড়া পরিবেশ রক্ষায় খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের জন্য ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০,২৫০টি গাছ কেনা হয়েছে বলে দাবি করেন, যা বৃষ্টির কারণে এখনও রোপণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেন, খাল দুটির বিভিন্ন অংশে ২ থেকে ৪ ফুট গভীরতায় খনন করা হয়েছে এবং নিয়মিত তদারকি করায় অনিয়মের সুযোগ নেই। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সবিতা সরকার: নিজের ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে ইউএনও সবিতা সরকার জানান, সরকারি বরাদ্দ সঠিক নিয়মে এবং শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখেই কাজ নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা নিয়মিত বিভিন্ন স্পটে গিয়ে কাজের পরিমাপ ও গভীরতা যাচাই করছি। নকশাবহির্ভূত বা অনিয়মের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”জেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থান: তদন্ত কমিটি গঠন ডুমুরিয়া উপজেলার এই মেগা প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত-এর মুখোমুখি হলে তিনি অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেন।জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিখালী ও বিলডাকাতিয়ার নিমতলা খাল খনন প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সরকারি টাকা হরিলুট বা নির্দেশনাবহির্ভূত কাজ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খালের পানি না সরিয়ে কাদা উত্তোলন, ভেকু মেশিনের অবৈধ ব্যবহার কিংবা ভুয়া শ্রমিক তালিকা তৈরির যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে, তা মাঠপর্যায়ে নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে যদি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), পিআইও বা স্থানীয় কোনো সিন্ডিকেটের দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যায়, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”স্থানীয় সচেতন মহলের এখন একটাই দাবি—তদন্ত যেন কাগুজে বাঘ হয়ে না থাকে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ডুমুরিয়ার মানুষকে আসন্ন কৃত্রিম বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করা হোক।

আরও সংবাদ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

©2025 khulnarsamayerkhobor .com

Developed By: ShimantoIT