
নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় খুলনার অপরাধ জগত মানেই ছিল একটি নাম—এরশাদ শিকদার। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য, ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের গল্প এখনও নগরীর মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত। ২০০৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে সেই ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও দুই দশক পর আবারও নতুন উদ্বেগে খুলনাবাসী। স্থানীয়দের ভাষায়, একজন এরশাদ শিকদারের পতন হলেও জন্ম নিয়েছে বহু ‘নয়া এরশাদ’। নগরীর অলিগলি থেকে আদালতপাড়া, ব্যবসাকেন্দ্র থেকে জনবহুল সড়ক—সবখানেই এখন আলোচনার বিষয় সন্ত্রাস, খুন ও আধিপত্যের রক্তাক্ত রাজনীতি।সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুলনায় অপরাধপ্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, প্রতিশোধমূলক সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীর আট থানাজুড়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসীর সংখ্যা ১৮১ জন। সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১০টি সংঘবদ্ধ অপরাধী গ্রুপ।শুধু পরিসংখ্যান নয়, বাস্তব চিত্রও উদ্বেগজনক। আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ব্যস্ত সড়কে কুপিয়ে খুন, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা—এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলেছে। একসময় যে খুলনা শান্ত ও নিরাপদ নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেখানে সন্ধ্যার পর অনেকেই অপ্রয়োজনে বাইরে বের হতে চান না।খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একের পর এক হত্যাকাণ্ড মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, “এরশাদ শিকদারের সময় খুলনা সন্ত্রাসের জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল। এখন প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, আদালতপাড়ায় খুন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতা মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, একজন এরশাদ শিকদারের জায়গায় অনেক ‘নয়া এরশাদ’ তৈরি হয়েছে।”তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর কথা বলছে পুলিশ। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং আইন অমান্যকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, মাদক বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের পুনর্গঠন খুলনায় অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।একসময় যে শহর এরশাদ শিকদারের সন্ত্রাস সাম্রাজ্যের অবসান দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, সেই খুলনাই আজ আবার নতুন করে প্রশ্নের মুখে—সন্ত্রাসের সেই অন্ধকার অধ্যায় কি সত্যিই শেষ হয়েছে, নাকি নতুন নামে, নতুন মুখে আবারও ফিরে এসেছে?
