
পরেশ দেবনাথ, বিশেষ প্রতিনিধি :চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন কেশবপুরের কৃতি সন্তান মানবিক ডাক্তার কামরুজ্জামান (৫২)। বুধবার (২২ এপ্রিল-২৬) সকাল ১০টার দিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। ডাক্তার কামরুজ্জামান খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অস্থি ও ট্রমা বিশেষজ্ঞ) ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। সদ্য প্রয়াত ডাক্তার কামরুজ্জামান কেশবপুর উপজেলার সুফলাকাটি ইউনিয়নের হাড়িয়াঘোপ গ্রামের মৃত লোকমান মোল্লার বড় ছেলে। তিনি তাঁর পরিবারসহ ঢাকার নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করতেন। আর তিনি ছিলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থপেটিকস বিভাগের সিনিয়র চিকিৎসক।ডাক্তার কামরুজ্জামানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চারিদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া। ঢাকা স্কয়ার হাসপাতাল থেকে শববাহী গাড়িতে তাঁর নিথর দেহ রাত সাড়ে নয়টায় যখন কেশবপুর পাবলিক ময়দানে এসে পৌঁছায় তখন অসংখ্য মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। আজ তাঁর জানাযায় ক্রন্দনরত শোকার্ত হাজারো মানুষের ঢল, বেদনায় শূন্যতায় মুহ্যমান, যেনো কী অমূল্য রতন হারিয়েছে। তুমি অগণিত মানুষের মনোমন্দিরে অমর হয়ে রবে।বুধবার (২২ এপ্রিল-২৬) এশার নামাজ বাদ কেশবপুর পাবলিক ময়দানে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোক্তার আলী, খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক শেখ আবু শাহিন, কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার রেহেনেওয়াজ, সাবেক মেয়র আব্দুল সামাদ বিশ্বাস, সাংবাদিকবৃদ-সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। রাত সাড়ে ৯টায় সুফলাকাটি ইউনিয়নের হাড়িয়াঘোপ নিজ গ্রামে জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের পাশেই হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। কেশবপুরের আপামর মানুষের শ্রদ্ধার এক মানবিক সেবক, মানবতার ফেরিওয়ালা ডাক্তার কামরুজ্জামান। যে মানুষটি বিগত ২৪ বছর অন্যের যন্ত্রণাকে নিজের অন্তরে ধারণ করে নিরাময়ের পথ নির্মাণ করেছেন, তাঁর এই আকস্মিক অকাল প্রস্থান মেনে নেবার নয়।কেশবপুরে কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা এক মানবিক ডাক্তার কামরুজ্জামান গরীব ও অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করাসহ সহযোগিতা করতেন। সেকারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত গরিব মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। নারায়ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে এস. এস. সি খুলনা বি. এল কলেজ থেকে এইচ. সি. সি কৃতিত্বের সাথে পাস করে ঢাকা স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি এমবিবিএস পাশ করে বিসিএস উত্তীর্ণ হন। সাথে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছেন একের পর এক। তাঁকে পোস্টিং দেয়া হয় কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তিনি কেশবপুর হোসেন প্যাথলজি এন্ড হাসপাতালে ও তাঁর জন্মভূমি সুফলাকাটী ইউনিয়ন নিয়মিত সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা দিতেন। তিনি ডাক্তার হওয়ার পর তাঁর বাবা বলেছিলেন গ্রামের মানুষকে সেবা করতে। শত ব্যস্থতার মাঝেও তিনি বাবার কথা রাখতেন। কোন প্রকার ফি ছাড়াই নিজ এলাকার বাড়িতে রোগী দেখতেন। কেশবপুরের মানুষের মাঝে হয়ে উঠেছিলেন প্রিয় মুখ। মুখের হাসিতেই মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রীয় করে তুলেছিলেন।কেশবপুরের সবার প্রিয় মুখ ডা. কামরুজ্জামান শুধু একজন দক্ষ চিকিৎসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গরিব, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য তার দরজা ছিল সবসময় উন্মুক্ত। অনেক সময় তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করতেন, কারও কষ্ট দেখলে নীরবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তার মমতা, সহানুভূতি ও উদারতা মানুষের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে। তিন তাঁর পিতার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন পালন করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁরমতো আন্তরিক ও হাসিমাখা নিয়ে মানুষ খুব কম হয় জগতে।কেশবপুর নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে মরহুমের রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান এডভোকেট আবুবকর সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক স্বপন মন্ডল, যুগান্তর প্রতিদিন আজিজুর রহমান, প্রথম আলো প্রতিনিধি দিলীপ মোদক, কেশবপুর প্রেসক্লাবের সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ, ক্রীড়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ অধ্যাপক প্রবেশ কুমার দাস।তাঁর অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সমবেদনা জানিয়েছেন, কেশবপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোক্তার আলী, কেশবপুর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব আবুল হোসেন আজাদ, কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার রেহেনেওয়াজ। অন্যদিকে, একজন মেধাবী, দক্ষ, সৎ, নিষ্ঠাবান, অভিজ্ঞ, পরিশ্রমী, সদালাপী ও দেশপ্রেমিক চিকিৎসকের প্রয়াণে গভীর শোক এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আরও সমবেদনা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (প্রশাসন) মোঃ রেজাউল করিম, সাপ্তাহিক পল্লীকথা পত্রিকার তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ, পাঁজিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার পরিচালক বাবুর আলী গোলদার, ফুলতলা উপজেলার জামিরা বাজার আসমোতিয়া স্কুল এন্ড কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, লেখক, প্রাবন্ধিক তাপস মজুমদার, তাঁর শিশুকালের বেতিখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (অবঃ) মোঃ শহিদুল ইসলাম, সুফলাকাটী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম মনজুরুল ইসলাম-সহ কেশবপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিকবৃন্দ।আসলে পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছ তাঁরা “এমনি এসে ভেসে যায়।’ রেখে যায় মানুষের মনে নিঃস্বার্থ গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
