
🌹 যাদের সীমাহীন কোরবানির বিনিময়ে আমি দুনিয়ার আলো-বাতাস দেখছি 📖 পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব — কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا সরল অনুবাদ:“আর তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।”— সূরা আল-ইসরা: ২৩ 🌿 আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা: এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমেই তাওহীদের নির্দেশ দিয়েছেন—একমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে হবে। এরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে পিতা-মাতার মর্যাদা ও অধিকার কত মহান, তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।মানুষ যখন ছোট থাকে, তখন পিতা-মাতা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তারা কত রাত না ঘুমিয়ে কাটান, কত কষ্ট সহ্য করেন, কত ত্যাগ স্বীকার করেন—তার কোনো হিসাব নেই। যাদের সীমাহীন কোরবানির বিনিময়ে আমরা আজ দুনিয়ার আলো-বাতাস দেখছি, সেই পিতা-মাতাই যখন বার্ধক্যে উপনীত হন, তখন তাদের প্রতি বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা, সামান্য ‘উফ’ বলাও আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন।💠 “উফ” কেন নিষিদ্ধ? আল্লাহ বলেন— فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ “তাদেরকে ‘উফ’ বলো না।”অর্থাৎ তাদের কোনো কথায় বিরক্ত হয়ে এমন সামান্য শব্দও উচ্চারণ করা যাবে না, যা তাদের মনে কষ্ট দেয়।এরপর আল্লাহ বলেন— وَلَا تَنْهَرْهُمَا “তাদের ধমক দিও না।”অর্থাৎ চিৎকার করা, রূঢ় ভাষায় কথা বলা, অপমান করা কিংবা অসম্মানজনক আচরণ করা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।এরপর বলেন— وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا “তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।”অর্থাৎ পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলতে হবে নম্রতা, ভালোবাসা, সম্মান ও কোমলতার সঙ্গে।📜 পিতা-মাতার মর্যাদা: হাদিসের আলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো—“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?”তিনি বললেন, সময়মতো সালাত আদায় করা।জিজ্ঞাসা করা হলো, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, “পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।”–সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম,অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—“যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার একজন অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, অথচ তাদের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।”— সহিহ মুসলিম 🌸 আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় : ১. সর্বপ্রথম আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। ২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা আল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ।৩. পিতা-মাতাকে বিরক্ত হয়ে ‘উফ’ বলাও নিষেধ। ৪. তাদের ধমক দেওয়া, চিৎকার করা বা অপমান করা যাবে না। ৫. তারা বৃদ্ধ হলে তাদের সেবা-যত্ন করা সন্তানের বিশেষ দায়িত্ব। ৬. তাদের সঙ্গে সর্বদা সম্মানজনক ও কোমল ভাষায় কথা বলতে হবে। ৭. পিতা-মাতার সেবা জান্নাত লাভের অন্যতম বড় সুযোগ।৮. মনে রাখতে হবে—আজ তারা দুর্বল; একদিন আমরাও বার্ধক্যে পৌঁছাব।❤️ একটু নিজের দিকে তাকাই : যে মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, যে বাবা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে আমার ভবিষ্যৎ গড়েছেন,যারা আমার অসুস্থতায় রাত জেগেছেন, যারা আমার মুখে হাসি দেখার জন্য নিজেদের কষ্ট লুকিয়েছেন—আজ তাদের বৃদ্ধ বয়সে আমি কি তাদের বোঝা মনে করছি?যাদের সীমাহীন কোরবানির বিনিময়ে আমি দুনিয়ার আলো-বাতাস দেখেছি, তাদের জীবনের শেষ সময়টুকু কি আমি ভালোবাসা, সম্মান ও সেবায় ভরিয়ে দিতে পারছি?🤲 পিতা-মাতার জন্য কুরআনের দোয়া : আল্লাহ তাআলা আমাদের শিখিয়েছেন—رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا “হে আমার রব! তাদের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।”— সূরা আল-ইসরা: ২৪🌹 শেষ কথা :পিতা-মাতা শুধু আমাদের জন্মদাতা নন; তারা আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয় এবং অসংখ্য ত্যাগের প্রতী ক।তারা জীবিত থাকলে তাদের মূল্য দিন,তাদের সেবা করুন,তাদের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলুন,তাদের দোয়া নিন।কারণ পিতা-মাতা চলে গেলে অনেক কিছুই ফিরে পাওয়া যায়—কিন্তু তাদের হারানো ভালোবাসা আর ফিরে পাওয়া যায় না।আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবিত পিতা-মাতার খেদমত করার এবং ইন্তেকালকারী পিতা-মাতার জন্য বেশি বেশি দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
