
ডেস্ক :
খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালের বেসমেন্টে থাকা জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়ার তীব্র আতঙ্কের মাঝেও পুরো হাসপাতালজুড়ে দেখা গেছে মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত সাড়ে ৯টায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন অল্প সময়ের মধ্যে ওপরের কয়েকটি ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের চেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করে ঘন কালো ধোঁয়া। ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে রোগীদের পাশাপাশি স্বজন ও কর্মরতদেরও সঙ্গিন অবস্থা হয়। জীবন বাঁচাতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন। তবে এই চরম সংকটের রাতে বিভিন্ন মানবিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে খুলনাবাসী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উঠে এসেছে সেসব হৃদয়স্পর্শী গল্প।নাজনীন ঊর্মি নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গতকাল রাতটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের হতে পারত, কিন্তু এক নিমিষেই সেই আনন্দ রূপ নিল চরম বিষাদে আর আতঙ্কে। আমার ছোট বোন তখন ওটিতে, মাত্রই এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে সে। ঠিক তখনই খবর এলো সিটি মেডিকেল হাসপাতালে আগুন লেগেছে। চারদিকে তখন শুধু কালো ধোঁয়া, মানুষের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি আর বাঁচার আকুল চিৎকার। বিদ্যুৎ চলে গেল, ওটির ভেতরে তখনো আমার বোনেরসিজারিয়ানের সেলাই বাকি। এমন এক মৃত্যুভয়ের মুহূর্তেও দেবদূতের মতো অনড় রইলেন ডাক্তাররা। তারা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় আমার বোনের সেলাই শেষ করলেন। ডাক্তারদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।’তিনি আরও লিখেছেন, ‘অন্যপাশে তখন আর এক মানবিক ও ভালোবাসার মহাকাব্য লিখছিলেন আমার বোনজামাই। সবাই যখন নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, তিনি তখন সদ্যজাত ছোট্ট কলিজার টুকরোটাকে বুকে চেপে ওটির বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে জেনেও, নিজের জীবনের পরোয়া না করে প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে এক বিন্দু সরেননি। স্ত্রীকে ও সন্তানকেআগলে রেখেছিলেন পরম মমতায়। একেই বোধহয় বলে সত্যিকারের ভালোবাসা, একেই বলে প্রকৃত জীবনসঙ্গী। মৃত্যুর দুয়ার থেকে এক নতুন জীবনের স্পন্দন নিয়ে ফিরে এসেছে ওরা। আমাদের পরিবারের এক অলৌকিক আলো, আমাদের অগ্নি কন্যা।’সংবাদকর্মী এম এ সাদি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘আগুনের চেয়ে ধোঁয়া বেশি হওয়ার কারণে বাইরের চিত্র ধারণ করে হাসপাতালের মেইন গেট দিয়ে আমি প্রথম তলা হতে ১৫ তলার ছাদ পর্যন্ত যাই সংবাদ সংগ্রহের জন্য। গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোর সামনে ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও হাসপাতালের কর্মচারীদের দেখতে পাই। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা রোগী উদ্ধারে হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে ছোটাছুটি করতে থাকে।’তিনি আরও জানান, কেবিনের এক ওয়ার্ড বয় রোগী ও স্বজনদের মনোবল দিতে বলছিলেন, ‘আমি মরে গেলেও আপনাদের বিপদে ফেলে যাবো না। ধোঁয়া কমলেই আপনাদের নিচে নিয়ে যাবো।’ সেই ওয়ার্ড বয় সত্যিই তাদের ছেড়ে যাননি। এছাড়া খুলনার অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্স চালক বিনামূল্যে অসংখ্য রোগীকে বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন।এদিকে বেসরকারি গাজী মেডিকেল কর্তৃপক্ষ রাতেই সিটি মেডিকেল থেকে স্থানান্তরিত রোগীদের চিকিৎসা ফ্রি ঘোষণা করে। তুহিন ও মইন নামের দুজন স্বেচ্ছাসেবী বলেন, ‘একশ বা দুইশো টাকার জন্য যে অ্যাম্বুলেন্স চালকরা রোগীদের জিম্মি করে রাখে, তারা যেভাবে মানবসেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা আসলে সত্যিই আমাদের কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’সুমন রায় নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজে যখন আগুন লেগে চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার, তখন আইসিইউর দায়িত্বে থাকা এক ডাক্তারের খোঁজ নিতে ফোন করেছিলেন তিনি। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো হাঁসফাঁস করা এক ভীষণ ব্যস্ত কণ্ঠ, ‘চারপাশে প্রচণ্ড ধোঁয়া, নিঃশ্বাস নেয়া কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবুও একটা রোগীও ইভাকুয়েট (নিরাপদে সরানো) করার আগে আমরা এখান থেকে নামছি না। আর মাত্র ৩টারোগী বাকি আছে, ওদের সরিয়েই আমরা নামার চেষ্টা করব।’ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক ওস্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অধিকাংশ রোগীকে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়। গুরুতর ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
