
বিএম আলামিন ইসলাম,কয়রা(খুলনা) প্রতিনিধি: সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এতে ম্যানগ্রোভ বন, জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার স্থানীয় শিক্ষক, পরিবেশকর্মী ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ‘মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়নের দাবি উঠেছে।বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী কাটকাট এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইয়ুথ ফর দ্য সুন্দরবন’ কয়রা শাখার উদ্যোগে সুন্দরবনের দূষণ হ্রাস ও বাস্তুসংস্থানের উন্নয়ন বিষয়ক অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহযোগিতা করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তরের ইকো প্রকল্প।কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আ.ব.ম. আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আহমেদের সঞ্চালনায় সভায় স্থানীয় শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবী, সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রূপান্তরের প্রতিনিধি অনুপ রায়। তিনি বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন ১৭টি উপজেলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করে কাজ চললেও প্লাস্টিক ও পলিথিন এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো ম্যানগ্রোভ গাছের শ্বাসমূলের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে, বন্যপ্রাণী ও মাছের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। এমনকি মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহেও প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে না তুললে সুন্দরবনে প্লাস্টিকের দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়।‘ইয়ুথ ফর দ্য সুন্দরবন’ কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি নিরপদ মুন্ডা জানান, সংগঠনের শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী নিয়মিতভাবে কাজ করছেন। সম্প্রতি সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ের একটি খাল থেকে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। পর্যটনকেন্দ্র ও সামাজিক অনুষ্ঠানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।তারা আরও বলেন, বনের ভেতরে সুন্দরী গাছ ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বন বিভাগের নজরদারির ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের মতো কর্মকাণ্ড জলজ বাস্তুসংস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।কয়রা উপজেলা পানি কমিটির সভাপতি এইচ এম শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, কয়েক দশক আগে সুন্দরবন অনেক বেশি সুরক্ষিত ছিল। এখন শুধু পলিথিন নিয়ন্ত্রণ নয়, এর উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া কেবল সচেতনতা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।কয়রা উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম আকরাম হোসেন বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় এখনই সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ‘মাস্টার প্ল্যান’ প্রয়োজন। শুধু ডাস্টবিন স্থাপন নয়, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, রিসাইক্লিং এবং বৈজ্ঞানিক ডাম্পিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে পাইলট প্রকল্প ও স্বেচ্ছাসেবী কমিটি গঠনের মাধ্যমে তরুণদের সুন্দরবন রক্ষায় সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
