নাজমুস সাকিব, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো বস্তুনিষ্ঠতা। সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা বলতে ন্যায্যতা, নিরপেক্ষতা, তথ্যনিষ্ঠা ও পক্ষপাতহীনতাকে বোঝায়। অর্থাৎ, কোনো ঘটনা বা বিষয়কে ব্যক্তিগত মতামত, বিশ্বাস কিংবা স্বার্থের প্রভাবমুক্ত থেকে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করাই হলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য।সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার ধারণার উদ্ভব ঘটে অষ্টাদশ শতাব্দীতে। সময়ের সঙ্গে এই ধারণা নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিকল্প মতের সৃষ্টি হলেও সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের আলোচনায় বস্তুনিষ্ঠতা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গতিশীল নীতি হিসেবে বিবেচিত।বিশ্বের অধিকাংশ সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল তাদের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে সংবাদ সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এজেন্স ফ্রান্স-প্রেস (AFP), অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP), রয়টার্স (Reuters) এবং এজেন্সিয়া ইএফই (EFE)-এর মতো প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো শুরু থেকেই গ্রাহকদের জন্য নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সরবরাহের নীতিতে কাজ করে আসছে। তারা সাধারণত রক্ষণশীল বা উদারপন্থী গণমাধ্যমের জন্য আলাদা সংবাদ সরবরাহ না করে একই তথ্যভিত্তিক সংবাদ সেবা দিয়ে থাকে।সাংবাদিক জোনাথন ফেনবির মতে, ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য সংবাদ সংস্থাগুলো প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব এড়িয়ে চলে। তাদের প্রধান সম্পদ হলো সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য। তারা সাধারণত তথ্যের উৎস উল্লেখ করে, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা মতামত চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং সন্দেহ বা অস্পষ্টতার পরিবর্তে যাচাই করা তথ্যকে গুরুত্ব দেয়। ফলে বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতাই সংবাদ সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের অন্যতম দার্শনিক ভিত্তি হয়ে উঠেছে।সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাকে সঠিক তথ্য প্রদান করা, যাতে তারা নিজেরাই কোনো ঘটনা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে মতামত গঠন করতে পারেন। একজন সাংবাদিক কোনো তথ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে একমত বা দ্বিমত পোষণ করলেও প্রতিবেদনে সেই ব্যক্তিগত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটানো উচিত নয়।একটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদে তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট এবং যাচাইযোগ্য উৎসকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অন্য কোনো পক্ষের প্রতি সমর্থন সংবাদ উপস্থাপনে প্রভাব ফেলতে পারে না।অতএব, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা শুধু নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশনের একটি পদ্ধতি নয়; এটি সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সঠিক তথ্য, ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপন এবং ব্যক্তিগত পক্ষপাত থেকে মুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একজন সাংবাদিক দায়িত্বশীল ও পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা করতে পারেন।