ডুমুরিয়া (খুলনা) থেকে শেখ মাহতাব হোসেন
খুলনার ডুমুরিয়ায় সিংগা নদীর ওপর মাত্র ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও। এক বছরে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় ভুগছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।দীর্ঘ ৩৬ বছরের দাবি ও প্রকল্পের শুরু স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের টিপনা সিংগা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য গত ৩৬ বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন নদীর দুই পারের টিপনা, সিংগা গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ বাসিন্দার যাতায়াত সহজ করতে এখানে একটি সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার।প্রকল্পের বিবরণ ও ঠিকাদারি জটিলতা উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় (LGED) সূত্রে জানা যায়:দৈর্ঘ্য: ৬০ মিটার।মোট বাজেট: ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা (প্রাথমিক বরাদ্দ ও পরবর্তীতে সংশোধন)।কার্যাদেশ প্রদান: ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর।কাজের দায়িত্ব: যৌথভাবে কাজ পায় ‘আকন ট্রেডিং’ ও ‘মাহফুজ খান (জেভি)’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।কাজ শেষের মূল সময়সীমা: ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর।নির্ধারিত সময়ের পর গত কয়েক বছরে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজের অগ্রগতি অর্ধেকের মতো। মাঝপথে ঠিকাদারের মৃত্যুর খবর এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে ব্রিজের মূল কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্প এলাকায় স্তূপ করে রাখা রড ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীতে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে।এলাকাবাসীর ভোগান্তি ও বর্তমান চিত্র সিংগা গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই গ্রামে বহু পরিবারের বসবাস রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মন্দির।যাতায়াতে ঝুঁকি: বর্তমানে এলাকাবাসী নিজেদের অর্থায়নে সেতুর পূর্ব পাশ ঘেঁষে বাঁশ ও কাঠের তক্তা দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত করছেন।নৌকার ওপর নির্ভরতা: বর্ষা মৌসুমে ডিঙ্গি নৌকাই পারাপারের একমাত্র ভরসা। কোমলমতি স্কুলগামী শিশুদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়।চিকিৎসা সংকট: সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন গর্ভবতী মা ও জরুরি রোগীরা। কোনো মানুষ অসুস্থ হলে তাকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে।এলাকার সাধারণ মানুষ ও পথচারী মোঃ নিছারআলি সরদার, শিবপদ গাইন ও অনিমেষ আমাদের প্রতিনিধি শেখ মাহতাব হোসেনকে ক্ষোভের সাথে জানান, “দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর সেতু বরাদ্দ পেলেও ঠিকাদারের গাফিলতি আর প্রশাসনের উদাসীনতার বলি হচ্ছি আমরা। প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে ভয়ে থাকি। অবিলম্বে এই সেতুর বাকি কাজ শেষ করে আমাদের মুক্তি দিন।“এ বিষয়ে স্থানীয় খর্ণিয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোল্লা আবুল কাশেম জানান, "সেতুটি আমাদের এলাকার মানুষের জন্য একটি স্বপ্নের মতো ছিল। কিন্তু আট বছর ধরে এটি অর্ধেক হয়ে পড়ে থাকায় এখন তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মেম্বার হিসেবে প্রতিদিন আমাকে সাধারণ মানুষের হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, অথচ লিজ বা ঠিকাদারের আইনি জটিলতার কারণে আমি নিজে চাইলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না।"তিনি আরও বলেন, "সামনে বর্ষাকাল আসছে। বর্ষা এলেই নদীর পানি বেড়ে গিয়ে আমাদের বানানো অস্থায়ী সাঁকোটি ডুবে যায়। তখন পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের পারাপারে চরম বিঘ্ন ঘটে। আমি প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, আমাদের এই দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে যেন অতি দ্রুত এই সেতুর কাজ শেষ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।"ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ দারুল হুদা জানান, ওই এলাকার মানুষের জন্য ব্রিজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল ঠিকাদারের মৃত্যুর কারণে আইনি ও টেকনিক্যাল জটিলতায় নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে ব্রিজের সিসি এবং পিসি গার্ডারসহ প্রধান কাঠামোর কাজ অনেকটাই এগিয়ে আছে। বাকি কাজ সম্পন্ন করার জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুতই অন্য ঠিকাদার বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজটি পুনরায় শুরু করে জনদুর্ভোগ লাঘবের চেষ্টা চলছে।ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার বলেন, “জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি নিয়ে এলাকাবাসীর ভোগান্তি আমরা বুঝতে পারছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আইনি জটিলতা নিরসন করে দ্রুত কাজ পুনরায় শুরু করতে উপজেলা প্রশাসন এলজিইডি-র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত সমন্বয় করছে।“খুলনা জেলা এলজিইডি-র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল ইসলাম সরদার জানান, জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রকল্পটি দ্রুত সচল করার লক্ষ্যে লজিস্টিক ও আইনি প্রক্রিয়াগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই এর ইতিবাচক সমাধান আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।