শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা
টানা কয়েক দিনের তীব্র ও অতি তীব্র তাপপ্রবাহে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলাসহ সমগ্র দক্ষিণ অঞ্চলের জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তীব্র রোদের সাথে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। একদিকে মাঠের ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা, অন্যদিকে তীব্র গরমে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডায়রিয়া ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকা রোগীর সংখ্যা। মাঠ প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও কৃষি বিভাগ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।কৃষিতে পানির সংকট ও ফসল রক্ষায় তৎপরতাতীব্র তাপদাহের কারণে মাঠের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে খরিফ মৌসুমের সবজি ও বিভিন্ন ফসল রক্ষা করতে কৃষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।এই বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা বলেন,"টানা তাপদাহের কারণে মাঠের শাকসবজি, তিল এবং অন্যান্য গ্রীষ্মকালীন ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তীব্র রোদে ফসলের জমি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা কৃষকদের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। ফসলের গোড়ায় আর্দ্রতা ধরে রাখতে সন্ধ্যার পর বা ভোরে পর্যাপ্ত সেচ দেওয়ার এবং মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করার জন্য বলা হচ্ছে। এছাড়া ফল ও সবজি ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজনীয় হরমোন ও ভিটামিন স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসান থেকে বাঁচতে পারেন।"হাসপাতালে রোগীর ভিড় ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রচণ্ড গরমের কারণে উপজেলাজুড়ে ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি, কাশি এবং বিশেষ করে শিশুদের মাঝে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তীব্র রোদে কাজ করতে গিয়ে অনেক শ্রমজীবী মানুষ হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে পড়ছেন।সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ কাজল মল্লিক বলেন,"তীব্র গরমের কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত রোগীর চাপ আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আমরা আউটডোর ও ইনডোরে চিকিৎসা সেবা স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত ওরস্যালাইন, আইভি ফ্লুইড এবং জরুরি ওষুধের মজুত নিশ্চিত করেছি। এই সময়ে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া সরাসরি রোদে না যাওয়ার, প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করার এবং বাসি-খোলা খাবার পরিহার করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।"মাঠ প্রশাসনের নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধিতীব্র তাপপ্রবাহের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎপর রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার বলেন,"তীব্র তাপপ্রবাহের এই দুর্যোগে উপজেলার খেটে খাওয়া মানুষ এবং সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে আমরা মাঠ পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছি। তীব্র রোদের সময় (বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত) অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হতে এবং বাইরে বের হলে ছাতা ও টুপি ব্যবহার করতে মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়া হিট স্ট্রোক বা যেকোনো জরুরি স্বাস্থ্য সংকটে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কৃষি ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছি।"আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বর্তমান অবস্থাস্থানীয় আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে গরমের অনুভূতি প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা না মেলা পর্যন্ত এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। তীব্র এই গরমে ডুমুরিয়ার সাধারণ মানুষ চাতক পাখির মতো মেঘের পানে চেয়ে আছেন—কখন নামবে স্বস্তির বৃষ্টি।