স্টাফ রিপোর্টার: মোহাম্মদ ইব্রাহিম
একসময় সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা ছিল আকাশছোঁয়া। শিক্ষক মানেই ছিলেন শ্রদ্ধা, সম্মান ও আদর্শের প্রতীক। একজন শিক্ষকের সামনে মাথা নত করতেন ছাত্র, অভিভাবক ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই সম্মান আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। শিক্ষক সমাজের অনেকেই আজ আক্ষেপ করে বলছেন, “হাতে ধরেছিলাম কলম, এখন কারো পাই না সম্মান।”জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে শিক্ষকরা যুগে যুগে মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। একজন ডাক্তার, প্রকৌশলী, প্রশাসক, বিচারক কিংবা রাজনীতিবিদ তৈরির পেছনেও একজন শিক্ষকের অবদান থাকে। অথচ সেই শিক্ষকই আজ অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা, অসম্মান ও নানা প্রতিকূলতার শিকার।একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, “আমরা ছাত্রদের মানুষ করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করি। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষকদের প্রতি সম্মান অনেকটাই কমে গেছে। ক্লাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গেলেও নানা অভিযোগের মুখে পড়তে হয়। নম্বর কম দিলে অভিভাবক অসন্তুষ্ট হন, বকা দিলে অভিযোগ আসে। ফলে শিক্ষকরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করতেও সংকোচ বোধ করেন।”শিক্ষাবিদদের মতে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতির কারণে শিক্ষকের প্রতি সম্মানবোধ কমে যাচ্ছে। একসময় ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা ও স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক ব্যবসায়িক বা সেবাগ্রহীতা-সেবাদাতার সম্পর্কের মতো হয়ে পড়েছে।বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দিলেও এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব শিক্ষকের চেয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে শিক্ষকের সরাসরি ভূমিকা ও মর্যাদা কিছুটা হলেও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।বিশ্ব শিক্ষক দিবস এলে শিক্ষকদের নিয়ে নানা আয়োজন, আলোচনা ও প্রশংসা করা হয়। ব্যানার, ফেস্টুন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে শিক্ষকদের অনেকেই সেই সম্মান ও মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত থাকেন।শিক্ষক সমাজের দাবি, শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব জীবনেও শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষককে সম্মান করা মানেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্মান করা, আর শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্মান করা মানেই একটি উন্নত ও সভ্য জাতি গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া।সমাজের কাছে আজ প্রশ্ন একটাই— যে হাতে কলম ধরে আমরা জ্ঞানের আলো চিনেছি, যে মানুষটি আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ দেখিয়েছেন, সেই শিক্ষককে আমরা আর কতদিন অবহেলা ও অসম্মানের চোখে দেখব?