স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা: অতি দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম নেওয়া ডুমুরিয়ার মাগুরখালি ইউনিয়ের খোরেরাবাদ গ্রামের নিশিতা মন্ডলের গল্পটা শুধু কষ্টের নয়, এটা এক অবিচল লড়াইয়ের গল্প। অজপাড়া গাঁয়ের এক কোণে, চারদিকে পানি আর বিলের মাঝে ছোট্ট একটা ঘরেই তার বড় হয়ে ওঠা। বর্ষা এলেই ঘর ডুবে যেত পানিতে, মেঝে ভিজে থাকত, আর প্রতিটা রাত কাটতো ভয় আর অনিশ্চয়তায়। তবুও সেই ছোট্ট মেয়েটা স্বপ্ন দেখতে ভোলেনি। গ্রামে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল না তেমন, স্কুল ছিল অনেক দূরে। বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিতে হয় মামার বাড়িতে। সেখানেও ছিল অভাব, ছিল সীমাবদ্ধতা। তবুও থামেনি নিশিতা। অল্প সুযোগ, অল্প আলো, আর অসংখ্য কষ্টকে সঙ্গী করেই সেখান থেকে সে এসএসসি পাশ করে। তারপর শুরু হয় নতুন এক পথচলা। আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় খুলনার পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু শহরে এসে যেন জীবনটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। থাকার খরচ, পড়াশোনার চাপ, সব মিলিয়ে প্রতিটা দিন ছিল সংগ্রামের।ছোটবেলায় স্থানীয় এক মাসির কাছ থেকে একটু আধটু রূপচর্চা শেখা, আর মায়ের কাছ থেকে সেলাই শেখা। এই দুটো দক্ষতাই তখন তার ভরসা। মামার বাড়িতে থাকতে থাকতে সামান্য পারিশ্রমিকে সেলাইয়ের কাজ করতো। কিন্তু খুলনায় এসে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে সেই কাজও বন্ধ হয়ে যায়। চারদিক যখন অন্ধকার মনে হচ্ছিল, তখনই সেই ছোটবেলার শেখা রূপচর্চার স্মৃতিটা আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। মনে মনে নিজেকে বলে, “কিছু একটা করতেই হবে, না হলে পড়াশোনা, থাকা, কিছুই চালানো সম্ভব না।”সেই থেকেই শুরু। নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার লড়াই।কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও কোথাও স্থির হতে পারেনি নিশিতা। পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে খেতে এক সময় নিরুপায় হয়ে ২০১৬ সালে বিয়ের পিঁড়িতে পা দেয় নিশিতা। সেখান থেকে বিয়ের পর দু’জন মিলে একটা স্বপ্ন দেখেছিল “আমরা একসাথে কিছু করব, নিজেরা ঘুরে দাঁড়াবো।” সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতেই শুরু হয় আরও বড় সংগ্রাম। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নেয় নিশিতা। একসাথে দুইটা কাজ, একদিকে বাকিতে পোশাক এনে বাসায় বসে বিক্রি, সাথে সেলাইয়ের কাজ। অন্যদিকে বিউটিশিয়ান হিসেবে নিজেকে দক্ষ করার জন্য অন্যের পার্লারে কাজ। দিন আর রাত দুটোর মাঝের পার্থক্য যেন ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। ১২-১৪ ঘন্টা কাজ। কখন সকাল, কখন রাত নিজেই বুঝে উঠতে পারতো না। কখনও খাওয়া হতো ঠিকমতো, কখনও হতো না। কখনও ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো, আবার কখনও ঘুম আসতো না চিন্তায়। হাজারো দিনের গল্প জমে আছে বুকের ভেতর কষ্টের, না পাওয়ার, অপমানের, লড়াইয়ের। আজ যখন পেছনে তাকায় নিশিতা, তখন সেই দিনগুলো মনে পড়লে চোখ ভিজে যায়। কারণ সেই কষ্টগুলোই তাকে বানিয়েছে আজকের সে। এই গল্পটা শুধু ব্যথার না। এই গল্পটা প্রমাণ করে, যে মেয়ে একসময় লোনা পানিতে ডুবে যাওয়া ঘরে থেকেও স্বপ্ন দেখেছিল, সে হার মানেনি।এখন নিশিতা মন্ডল খুলনার নিউমার্কেট এরিয়াতে রমণী ফ্যাশন এর প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর, এছাড়াও BWCCI-SiCip প্রজেক্ট বিউটিফিকেশন এন্ড এন্টারপ্রেনারশীপ ডেভেলপমেন্ট ট্রেইনার হিসাবে কর্মরত আছে যেটা CSS Hope Technical Intstitute। এছাড়াও NSDA ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি সার্টিফাইড CBT&A Level-4 একজন এসোসের।