ডেস্ক রিপোর্ট,রাসেল আহমেদ:
দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে খুলনা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও এবার সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ থেকে ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংসদেই খুলনার নারী নেত্রীরা সংসদে গিয়ে উপকূলীয় এলাকার সমস্যা, উন্নয়ন বৈষম্য ও নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত পরিস্থিতিতে এবার সংরক্ষিত আসনে খুলনা অঞ্চলের কোনো নারী প্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে হতাশা ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।নির্বাচনে ভালো ফলাফল করলেও সংরক্ষিত নারী আসনে খুলনা অঞ্চল থেকে কাউকে মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা এবার ভেঙে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।জানা যায়, খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১১টিতে জয়লাভ করে, যার মধ্যে খুলনা জেলার ৪টি আসন রয়েছে। এই ফলাফলের পর দলীয়ভাবে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় খুলনা অঞ্চলের একাধিক নারী নেত্রী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। সাবেক সংসদ সদস্যসহ অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় অনেক নারী নেত্রী থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়নে তাদের কেউই জায়গা পাননি।অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পাওয়া দলটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী চারটি সংরক্ষিত নারী আসনের সুযোগ পেলেও সেখানে খুলনা অঞ্চলের কোনো নারী নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং সিলেট, বগুড়া ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের নারী নেত্রীদের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি বড় কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলেও ভেতরে ভেতরে হতাশা বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের নারী নেতৃত্ব জাতীয় সংসদে না থাকায় ওই অঞ্চলের সমস্যা ও বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা তৈরি হতে পারে।ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, দ্বিতীয় সংসদ থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলের নারী নেত্রীরা সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে তারা উপকূলীয় দুর্যোগ, দারিদ্র্য, নারীর অধিকার ও উন্নয়ন বঞ্চনার বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরেছেন। সুলতানা জামান চৌধুরী, সৈয়দা নার্গিস আলী, বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, নূর আফরোজ আলী, হ্যাপি বড়াল ও গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকারসহ একাধিক নারী নেত্রীর ভূমিকা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।এবার সেই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ায় সামাজিক ও নারী সংগঠনগুলোর মধ্যেও আলোচনা চলছে। তাদের মতে, উপকূলীয় নারীদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে নারী প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা এবার অনুপস্থিত থাকায় একটি প্রতিনিধিত্বগত ঘাটতি তৈরি হয়েছে।ফোরাম খুলনার সভাপতি সিলভী হারুন বলেন, উপকূলীয় নারীদের সংগ্রাম ও বাস্তবতা সংসদে আগেও নারী নেত্রীরা তুলে ধরেছেন। এবার সেই সুযোগ না থাকায় আমরা হতাশ।খুলনা উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শামীমা সুলতানা শীলু বলেন, নারীদের সমস্যা নারীরাই সবচেয়ে কার্যকরভাবে সংসদে তুলে ধরতে পারেন। খুলনার প্রতিনিধিত্ব না থাকা উন্নয়ন বৈষম্যের বাস্তবতাকে আরও একবার সামনে এনেছে।মনোনয়নপ্রত্যাশী ও মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দা রেহেনা ঈসা বলেন, খুলনা ও বাগেরহাট থেকে নারী প্রতিনিধি থাকলে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটত। সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এবার সেই সুযোগ হয়নি।সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথমবার খুলনার নারী প্রতিনিধিত্ব অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নীরব হতাশা ও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।