ডেস্ক :
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম ঘোষণা দিয়ে কুমিল্লা নগরীতে সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ প্রকাশ্যে তাদের এ তৎপরতায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেওয়ার পর শুক্রবার বিকেলে নগরীর সংরাইশ এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ জন কিশোরের একটি দল মহড়া দেয়। এ সময় তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র এবং কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। এরপর নিজেদের নানা ফেসবুক পেজে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ওই ভিডিও।এ মহড়ার নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তার। এক গ্রুপ ভেঙে তৈরি হয় নতুন গ্রুপ। ওই তৈরি হওয়া নতুন গ্রুপের অভিষেক ঘটে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ওই মহড়ার মধ্যে দিয়ে। মূলত নতুন নেতা জানান দেন গ্রুপটি এখন তার।এমনই আরেকটি নতুন গ্যাং ‘ক্রাইম সেটাপ’ এর অভিষেকই ঘটেছে দুদিন হলো। গ্যাংটির সদস্যরা গোমতী নদীর তীরবর্তী এলাকায় সশস্ত্র মহড়া চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার বিকেলে ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার হয়ে চানপুর সারোয়ার স্কুল রোড পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোরের একটি সংঘবদ্ধ দল বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ মহড়া দেয়। তাদের হাতে রামদা, চাপাতি ও লাঠিসোটা ছিলো। সময় গ্যাংটির সদস্যরা সড়কে প্রকাশ্যে দাপট দেখায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পরিস্থিতির কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হন।এলাকাবাসীর দাবি, এ ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। এর আগেও একাধিকবার একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, গ্যাংটির অনেক সদস্য স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকি।সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান কালবেলাকে বলেন, নগরের আলোচিত ‘ঈগল গ্রুপ’ ও ‘রতন গ্রুপ’-এর মধ্যে প্রায়ই সশস্ত্র মহড়া ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে একসময়। এ দুটি গ্রুপ বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছিল। তাদের দ্বন্দ্বে বেশ কটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। এরা প্রায়ই শহরে সহিংস ঘটনা ঘটাত। পুলিশ তৎপর হলে তারা চুপ মেরে যায়। এখন শুনছি এ রকম ২০ থেকে ২৫টি গ্রুপ শহরে সক্রিয়। সম্প্রতি ঠাকুরপাড়া এলাকায় তারা বেশ কবার প্রকাশ্যে মহড়া দিয়েছে।মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট দাউদ আহমেদ সজিব ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেন, কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। ২০১৫ সালের দিক থেকে বিভিন্ন নামে একাধিক গ্রুপ গড়ে ওঠে। রতন, ঈগল, র্যাক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজসহ ২০ থেকে ২৫টি গ্রুপ বিভিন্ন সময় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় জড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব গ্যাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই শক্তিমত্তা প্রদর্শন করছে, যা উদ্বেগজনক।কাপ্তানবাজার এলাকার এক বৃদ্ধ বলেন, দেখলাম কিশোরদের একটি দল রামদা উঁচিয়ে সড়কে চিৎকার করতে করতে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে এভাবে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করবে—এটা ভাবা যায় না। এ এলাকায় আগে এ রকম অবস্থা দেখিনি।শহরের ভাটপাড়া এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ইদানীং বেড়েছে বলে স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন।এদিকে এমন ঘটনায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় অভিভাবক সমাজও। শহরের চানপুর এলাকার এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছি এই গ্যাংয়ের অনেকেই স্কুল-কলেজের ছাত্র। তাদের অধিকাংশ বখাটে, নেশাসক্ত। তাদের কাছে অস্ত্র আছে। এরা ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। আমাদের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছি। তাদের কোচিংকরতে বাইরে যেতে হয়।’শহরবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় এসব কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। দিন দিন আরও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠছে তারা। বিগত বছরগুলোয় কিশোর অপরাধীদের হাতে নগরে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় নতুন নতুন দলের নামে কিশোর অপরাধীদের বিস্তার ঘটছে। প্রতিবারই দেখা যায় ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেআইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিশোর অপরাধের বিষয়ে তৎপর হয়। তখন কিছু গ্রেপ্তারও হয়। কিন্তু ধারাবাহিক নজরদারি থাকে না। তা ছাড়া শহরে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল চোখে পড়ে না। পুলিশ একসময় এসব অপরাধ বাড়লে স্কুল-কলেজ বা এলাকায় মোটিভেশনাল সভা করত সবাইকে নিয়ে। এতে অপরাধ কমত। এখন এসব দেখা যায় না।কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার কালবেলাকে বলেন, শুক্রবার নগরের সংরাইশ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বন্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গত তিন মাসে ১৫৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে নতুন করে অনেক মামলায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের আদালতে পাঠানো হচ্ছে।