ডেস্ক :
ইরানের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর মাস অতিবাহিত হলেও বিদ্যমান অচলাবস্থা নিরসনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও দুপক্ষই যার যার অবস্থানে অনড় রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি স্থায়ী চুক্তির অনুপস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অমীমাংসিত এ লড়াই ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী এক ‘শক্তিক্ষয়ের সংঘাতে’ রূপ নিচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকিরমুখে ফেলেছে।অমীমাংসিত যুদ্ধের মূল্য: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান অবস্থাকে এরই মধ্যে অনেকে ‘অমীমাংসিত যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। কাতারে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত ইরান বিশেষজ্ঞ মেহরান কামরাভা আলজাজিরাকে বলেন, এ ‘যুদ্ধও নেই, চুক্তিও নেই’ পরিস্থিতি উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল।মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম মাসেই ওয়াশিংটনের খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালাতে গেলে মাসে অন্তত ৫৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এ বিপুল ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পাল্টা অবরোধের প্রভাব টের পাচ্ছে মার্কিন জনগণ। দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ৪ দশমিক ১৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদের কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা একই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককেও পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।প্রলম্বিত বনাম দীর্ঘায়িত সংঘাত: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরুতে ধারণা করেছিলেন এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হবে; কিন্তু অসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক চ্যান্ডলার উইলিয়ামস বলছেন, ভুল হিসাবের কারণে সংঘাতটি প্রলম্বিত হয়েছে।ইরানের বিরুদ্ধে ‘ঘাস কাটা’ কৌশল: তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ক্ষেত্রে ‘লো-ইনটেনসিটি’ বা কম মাত্রার যুদ্ধের কৌশল নিতে পারে।কিংস কলেজ লন্ডনের ইতিহাসবিদ মাইকেল কের বলেন, ইসরায়েল যেমন হামাস বা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে (যাকে তারা বলে ‘ঘাস কাটা’), যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে সেই কৌশল নিতে পারে।তবে কের সতর্ক করে বলেন, ইরানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এই কৌশল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনি যদি ইরানের ওপর ‘ঘাস কাটা’ কৌশল প্রয়োগ করেন, তবে ইরানকে কাতার, ইউএই বা কুয়েতে হামলা করা থেকে কে থামাবে?” তার মতে, বোমাবর্ষণ করে ইরানকে ইসরায়েলি আঞ্চলিক আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করার পশ্চিমা চিন্তা কখনোই সফল হবে না। বরং একটি স্থায়ী সমাধানের অভাবে এই অমীমাংসিত সংঘাত পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরস্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।