ডেস্ক :
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী বিভিন্ন সংস্থার এক্সিট পোল বা বুথফেরত সমীক্ষার যেসব ফলাফল আসছে সেসবের অধিকাংশতে বিজেপির জয়ের আভাস মিলছে। দেখা যাচ্ছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ‘ম্যাজিক ফিগার’ ছুঁয়ে ফেলেছে। অবশ্য কোনো কোনো সমীক্ষায় তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। তবে সর্বত্রই বিজেপি এবং তৃণমূলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বুথফেরত বা প্রাক-নির্বাচনী জনমত সমীক্ষা মেলে না। তবে মিলে যাওয়ার কিছু উদাহরণও রয়েছে। যদি মিলে যায় তাহলে তা হবে এই রাজ্যে বিজেপির জন্য এক অভাবনীয় বিজয়।এদিকে, বুথফেরত জরিপের ফলাফল নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী বিজেপির মধ্যে এরই মধ্যে বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বুথফেরত জরিপের ফলাফল মানতেই চাইছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে সমাজমাধ্যমে মুখ খুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।তার দাবি, বিজেপি টাকা দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে ওই সমীক্ষার ফল দেখাতে বাধ্য করিয়েছে। এ রাজ্যে তৃণমূল ২২৬টির বেশি আসনে জিতবে বলে তিনি নিশ্চিত, জানিয়েছেন মমতা।গতকাল বৃহস্পতিবার এক ভিডিওবার্তায় তিনি রাজ্যের মানুষের উদ্দেশে বলেছেন, ‘‘এত রোদের মধ্যেও, এত অত্যাচার সহ্য করেও আপনারা যেভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ। আমার কর্মীদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। ওরা প্রাণপণ লড়াই করেছে। অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে। যারা বাংলাকে জব্দ করতে চেয়েছিলেন, তারা ভোটবাক্সে জব্দ হয়ে গিয়েছেন।’বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে মমতা বলেন, ‘আমি আপনাদের নিশ্চিন্ত করে বলতে চাই, যেটা টিভিতে দেখাচ্ছে, গতকাল দুপুর ১টা ৮ মিনিটে বিজেপির অফিস থেকে সেই সার্কুলার জারি করা হয়েছে। টাকা দিয়ে বলা হয়েছে ওটা দেখাতে। জোর করে সংবাদমাধ্যমকে এটা করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমরা ২২৬ ক্রস করব। ২৩০-ও পেয়ে যেতে পারি। মানুষ যেভাবে ভোট দিয়েছেন, আমার পুরো ভরসা রয়েছে।’ভোটের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং এখানকার পুলিশের বাহিনীর যৌথ অত্যাচার তৃণমূল কর্মীদের সহ্য করতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন মমতা।সাতটি বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফলের পাঁচটিতে বিজেপি এগিয়ে, আর মাত্র দুটিতে তৃণমূল এগিয়ে আছে।আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল তৃণমূল। বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। ম্যাট্রিজের বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন পেতে চলেছে বিজেপি। তৃণমূল পেতে পারে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যান্য (বাম-কংগ্রেস ও নির্দল) ৬ থেকে ১০টি আসন।চাণক্য স্ট্র্যাটেজি পশ্চিমবঙ্গের যে সমীক্ষা প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন পেতে পারে। তৃণমূল পাচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যরা ৬ থেকে ১০টি আসন পেতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বাম এবং কংগ্রেসের আসন শূন্য।পিপল্স পাল্স-এর সমীক্ষায় তৃণমূল এগিয়ে। তারা পাচ্ছে ১৭৮ থেকে ১৮৯টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯৫ থেকে ১১০টি আসন। অন্যদের মধ্যে কংগ্রেস ১ থেকে ৩টি আসন এবং বামেরা শূন্য থেকে একটি আসনে জয় পেতে পারে বলে এই সমীক্ষায় দাবি করা হয়।প্রজা পোল-এর সমীক্ষা বলছে, বিজেপি ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসন পেতে পারে। তৃণমূল পেতে পারে ৮৫ থেকে ১১০টি আসন। অন্য দলগুলি শূন্য থেকে পাঁচটি আসনে জিততে পারে বলে এই সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে।পি-মার্কের সমীক্ষা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-কে এগিয়ে রেখেছে। তাদের মতে, এ রাজ্যে ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসনে জিততে পারে দলটি। অন্যদিকে, তৃণমূল পেতে পারে ১১৮ থেকে ১৩৮টি আসন। অন্যদের কোনো আসন পায়নি এই সমীক্ষায়।পোল ডায়েরির সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৪২ থেকে ১৭১টি আসন পেতে পারে বিজেপি। তৃণমূল পেতে পারে ৯৯ থেকে ১২৭টি আসন। অন্যদের পাঁচ থেকে নয়টি আসনে জেতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে এই সমীক্ষায়।জনমত পোল্স-এর সমীক্ষায় আবার তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। ১৯৫ থেকে ২০৫টি আসন পেয়ে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে দাবি করা হচ্ছে এই সমীক্ষায়। বিজেপি পেতে পারে ৮০ থেকে ৯০টি আসন। কংগ্রেসকে এক থেকে তিনটি আসন এবং বামদের শূন্য থেকে একটি আসন দেওয়া হয়েছে। অন্যরা পেতে পারে তিন থেকে পাঁচটি আসন।প্রথম দফার ভোটের ধারা বজায় থাকল দ্বিতীয় দফাতেও। রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা আগের চেয়ে কমলেও অনেকটা বেড়ে গেল ভোটদাতার সংখ্যা। দুই দফাতেই প্রচুর মানুষ বুথে গিয়ে ভোট দিলেন। এমনকি, যারা সাধারণত বুথমুখী হন না, তাদেরও এবার ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে দেখা যায়। রাজ্যে ভোটের হার ৯২ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে এরই মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সারা ভারতে সমস্ত বিধানসভা নির্বাচনে এ যাবৎ ভোটদানের হারে এটাই সর্বোচ্চ। সর্বভারতীয় রেকর্ড।নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এবার দুই দফা মিলিয়ে ৫১ লাখ ভোটার কম ছিল। তবে ভোট পড়েছে আগেরবারের তুলনায় ৩০ লাখেরও বেশি। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটের হার এখনো পাওয়া যায়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত কমিশন ৯২.৬৩ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানিয়েছে। দুই দফা মিলিয়ে ভোটের হার ৯২.৯৩ শতাংশ।মোট ভোটার কমে গেলে এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ ভোট দিলে সাধারণ হিসাবেই ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোট সেখানেই থামল না। ভোটের হার এই রাজ্যে নজির গড়ে ফেলল। এসআইআর-এর পর আরও রাজ্যে ভোট হয়েছে। ভোটারের সংখ্যা সেখানেও কমেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মতো ঘটনা অন্য কোথাও ঘটেনি।পরিসংখ্যান থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট—নানা কারণে যারা ভোট দিতেন না বা নানা কারণে যারা ভোট দিতে পারতেন না, তারা অনেকেই এবার ভোট দিয়েছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভোটের ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গের এই হিসাব বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। এতদিন ধরে ভোট দেননি যারা, তাদের ভোট এবার সব হিসাব উল্টে দিতে পারে। এই বাড়তি ভোটই হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণকারী!