ডেস্ক :
সিরাজগঞ্জের চৌহালীর খাস ধলাই আরআরকে দাখিল মাদ্রাসায় শরীরচর্চা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন মো. আব্দুস সালাম। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) মাদ্রাসাটি পরিদর্শনে যায়। এ সময় তার বিপিএড সনদ নিয়ে সন্দেহ হয়। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিকতর যাচাই করে দেখা যায়, সনদটি ভুয়া। তার এমপিও স্থগিতসহ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে ডিআইএ। একই সঙ্গে চাকরিকালে নেওয়া ৩৪ লাখ ২৯ হাজার ৭২৩ টাকা বেতন-ভাতা ফেরত আনতে বলা হয়েছে।তার মতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সনদ জালিয়াতি করে চাকরি করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল বিএম কলেজের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. আনিসুর রহমান চৌধুরী। তাকেও ফেরত দিতে হবে ১১ লাখ ১১ হাজার ৩৩৩ টাকা। একইভাবে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার রাঘবপুর রহমানিয়া ফাজিল মাদ্রাসার কম্পিউটার শিক্ষক রহিমা আক্তারকে ফেরত দিতে হবে ১১ লাখ ৬২ হাজার ৯১০ টাকা।তাদের মতো আরও ২৬২ জন শিক্ষক সনদ জালিয়াতি করে চাকরি পেয়েছেন—এমন প্রমাণ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ডিআইএ। একই সঙ্গে তাদের বেতন-ভাতা ফেরত আনতে সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তালিকা পাঠিয়েছেন।তথ্যমতে, এই ২৬২ জন শিক্ষকের মধ্যে ২৫১ জনের বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সনদ এবং ১১ জন জালিয়াতি করেছেন বিপিএড, বিএড, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ। এই জাল সনদধারীদের কাছ থেকে সরকার বেতন-ভাতা হিসেবে নেওয়া ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ফেরত পাবে। এর আগে চলতি মাসের ১২ তারিখ আরও ৪৭১ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের তালিকা পাঠিয়েছিল ডিআইএ। সেই তালিকার পর তাদের এমপিও বন্ধ, বেতন-ভাতা বাবদ এ পর্যন্ত নেওয়া টাকা ফেরতসহ কঠোর নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার নির্দেশনা দেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।ডিআইএ সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরে জাল সনদধারী শিক্ষকদের ধরতে তৎপর হয়েছে ডিআইএ। এরপর বিভিন্ন এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুরু হয় পরিদর্শন। ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার জাল সনদধারী শিক্ষককে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষকের কাছ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। যদিও এ ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের রয়েছে উদাসীনতা। ফলে এখনো কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা কিংবা টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।সূত্র আরও জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দেরিতে হলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি বিভাগ তাদের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চরম উদাসীন। দফায় দফায় তাদের সুপারিশ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর পেছনে জাল সনদধারী শিক্ষকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার এমপিও বাতিল করলে ভুক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে মামলা করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থানেওয়া সম্ভব হয় না।ডিআইএর একাধিক পরিদর্শকের সঙ্গে কথা বললে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাল সনদধারী শিক্ষকে সয়লাব। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সনদধারী শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। যে প্রতিষ্ঠানেই হাত দেওয়া যায়, সেখানেই দেখা যায় কোনো না কোনো শিক্ষক জাল সনদে চাকরি করছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একাধিক জাল সনদধারী শিক্ষক ধরা পড়ছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৭০ শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে অধ্যক্ষসহ ৫৫ জনই জাল সনদে চাকরি করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।তারা আরও বলেন, এখনো কয়েক হাজার শিক্ষকের ফাইল তদন্তাধীন রয়েছে। সেই তদন্ত শেষ হলে আরও অনেক জাল সনদধারী শিক্ষক চিহ্নিত হবেন। তবে ডিআইএর জনবল সংকটের কারণে এসব কাজে ধীরগতি রয়েছে। অর্গানোগ্রাম সংশোধন করে যদি ডিআইএর জনবল বাড়ানো হয়, তাহলে এ কাজে আরও গতি আসবে। একই সঙ্গে দেশ ও জাতির উপকার হবে।ডিআইএ সূত্র আরও জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় কোনো শিক্ষকের সনদ নিয়ে যদি সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে সনদটি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য সনদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠায় ডিআইএ। এরপর সনদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান যদি সনদটি ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদে বেশি জালিয়াতি হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস না করেই এনটিআরসিএর সনদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েরসনদ জালিয়াতি করে তারা চাকরি নিয়েছেন।ডিআইএর এক শীর্ষ কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘জাল সনদধারীদের তালিকা পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় তাদের এমপিও স্থগিত করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলে।’এ প্রসঙ্গে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জাল সনদধারী শিক্ষকদের আরেকটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) জহিরুল ইসলাম বলেন, তালিকা হাতে পাওয়ার পর আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।একই মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) সৈয়দ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন বলেন, এ তালিকা পাওয়ার পর আমরা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। এখন তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর আগে সাল সনদধারীদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগটি সঠিক নয়। তালিকা পাওয়ার পর আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিই। আমরা চিঠি দিলে তারা ব্যবস্থা নেবে না কেন?সার্বিক বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ কালবেলাকে বলেন, চাকরিতে যোগদানের সময় অবহেলা করে কিংবা বাইরে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে সনদগুলো যাচাই না করার কারণে এসব হয়েছে। আবার ডিআইএর ইন্সপেকশন ইউনিটে লোকবল কম থাকায় তারা সারা দেশে এগুলো মনিটর করতে পারছে না। তবে জাল সনদধারী ধরাপারছে না। তবে জাল সনদধারী ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে অনেক সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, আবার নেওয়া হলেও দেরি হয়—এসব নানা সমস্যা রয়েছে। পরিবেশ এমন হয়েছে যেন সবকিছু চোখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে। তবে ধাপে ধাপে সব শিক্ষকের সনদ যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে চাকরিতে যোগদানের সময় কেন সনদ যাচাই হয়নি—সে বিষয় খুঁজে বের করে জড়িতদেরসহ সনদ জালিয়াতি করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।