ডেস্ক :
রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে শাসন করায় শিক্ষার্থীর বিচারপতি বাবা ওই শিক্ষককে বাসায় ডেকে নিয়ে অপমান করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে ওই বিচারপতির শাস্তি দাবিতে গতকাল রোববার সকালে স্কুলের সামনে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। তবে বিক্ষোভকালে শিক্ষার্থীরা ওই বিচারপতির নাম আলী রেজা বলে উল্লেখ করলেও প্রধান বিচারপতি বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে বিচারপতির নাম সেলিম রেজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।শিক্ষার্থীদের দেওয়া স্মারকলিপি সূত্রে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৬ এপ্রিল দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস চলাকালে এক শিক্ষার্থী একটি বাংলা বাক্যের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে বলেন। শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল নিজেকে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি বাংলা বিষয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছ থেকে বুঝে নেওয়ার জন্য বলেন; কিন্তু নাছোড়বান্দা ওই শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝিয়ে না দেওয়ায় হঠাৎ শিক্ষকের স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করে। এ সময় বিষয়টি নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দিয়ে শাসন করেন। পরে তিনি শিক্ষার্থীর বিচারপতি বাবাকে ফোন করে ঘটনাটি জানান। একই সঙ্গে তাকে স্কুলে এসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ওই বিচারপতি স্কুলে না এসে উল্টো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে তার বাসায় ডাকেন। তবে দয়াল চন্দ্র বাসায় যেতে অস্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দেওয়ার হুমকি দেন ওই বিচারপতি। পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. নাসির উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষক দয়াল চন্দ্র ওই বিচারপতির বাসায় গেলে বিচারপতি ও তার সহধর্মিণী তাকে চরম অপমান করেন। একই সঙ্গে জোর করে শিক্ষার্থীর কাছে ক্ষমা চাওয়ান।বিষয়টি জানাজানি হলে গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে নামে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। তারা নানা স্লোগান দিয়ে বিচারপতির শাস্তি দাবি করে। এক পর্যায়ে শিক্ষক দয়াল চন্দ্রকে বিচারপতির বাসায় পাঠানোয় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ এন এম শামসুল আলমের রুমের নেমপ্লেট ভেঙে দেয় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।তাজুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী বলে, বিচারপতির ছেলে অপরাধ করেছে, তার বাবা তাকে শাস্তি না দিয়ে উল্টো শিক্ষককে ডেকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় অপমান করেছেন। এটা শুনে আমরা খুব কষ্ট পেয়েছি। আমরা বিচারপতির শাস্তি চাই।স্কুলটির দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাহিদ হাসান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, নাঈম রেজা নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গত ১৬ এপ্রিল ক্লাসে ডিস্টার্ব করলে দয়াল স্যার তাকে শাসন করেন। এ ঘটনার জেরে স্যারকে বাসায় ডেকে নিয়ে লাঞ্ছনা করেন বিচারপতি ও তার স্ত্রী। স্যারকে ছাত্রের পা ধরে মাফ চাওয়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। আজ স্কুলে গিয়ে দেখি শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ওই বিচারপতি ও অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তি চাইছেন। আর এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরেও নিশ্চুপ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আ স ম শামসুল আলম খানের পদত্যাগ দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা।’ভুক্তভোগী শিক্ষক শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল গণমাধ্যমকে বলেন, গত ১৫ এপ্রিলে স্কুলে ওই ঘটনার পরে আমাকে বিচারপতির বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। শুধু বিচারপতি নন, তার স্ত্রী-সন্তানও আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। আমাকে ফৌজদারি মামলার ভয় দেখান। তারা বলেন যে, আমার বিরুদ্ধে, শিক্ষার্থীকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ এনে ফৌজদারি মামলা করা হবে। এরপর আমি সহকর্মীদের ঘটনাটি জানাই।এ বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এএনএম শামসুল আলম খানের মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।এ অভিযোগের সত্যতা জানতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান ও স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হককে মোবাইল ফোনে কল দিলে রিসিভ করেননি। রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রশ্ন পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাহাত জানান, শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শেষে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে।তবে বিচারপতির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বিচারপতিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনে রমনা থানায় জিডি করেছেন তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আশিকুর রহমান। জিডিতে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বিচারপতির ছেলেকে কোচিংয়ে না যাওয়ার কারণে মারধর করেন। বিষয়টি জানার পর ওই শিক্ষককে কয়েকবার ফোন করেন বিচারপতি। তিনি ফোন রিসিভ না করায় অধ্যক্ষকে ফোন করে বিষয়টি জানান। অধ্যক্ষ এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে অধ্যক্ষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে ও অন্য একজন শিক্ষককে নিজের বাসভবনে চায়ের আমন্ত্রণ জানান বিচারপতি। পরে তারা বিচারপতির বাসায় গিয়ে নিজেদের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশ্বস্ত করেন। বিচারপতিও বিষয়টি সেখানেই সমাধান হয়েছে বলে ধরে নেন