ডেক্স :
সুন্দরবনঘেঁষা খুলনার উপকূলীয় জনপদে নিরাপদ খাবার পানির সংকট যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশ বছরের অধিকাংশ সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পানীয় হিসেবে ব্যবহার করছেন। লবণাক্ততার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারযোগ্য না হওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগও কার্যকর হচ্ছে না।স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় আশপাশের নদী-খাল ছিল মিঠাপানির উৎস। কিন্তু শিবসা, কাজীবাছা, কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই চিত্র এখন অতীত। বিশেষ করে কয়রা ও পাইকগাছায় ৬৭টি খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মিঠাপানির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে; সংকুচিত হয়েছে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল।পাইকগাছার শামুকপোতা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “বৃষ্টির পানিই আমাদের ভরসা। ট্যাঙ্কে পানি না থাকলে অনেক দূর থেকে এনে খেতে হয়। বর্ষাকালেও সব সময় মিঠা পানি মেলে না।”কয়রার বাগালি ইউনিয়নের বাসিন্দা হালিমা বেগমের কথায়, “লবণাক্ত পানি দিয়ে রান্না করা যায় না। খাওয়ার পানির জন্য প্রতিদিন কষ্ট করতে হয়। অনেক সময় কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।”প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্ফানের সময় দাকোপ ও কয়রার মানুষ চরম পানিসংকটে পড়েন। তখন জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্থা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করতে হয়।জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা অত্যন্ত বেশি। এ কারণে সব জায়গায় গভীর নলকূপ স্থাপন সম্ভব হয় না। তাই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর খননসহ বিকল্প ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটার বহু ইউনিয়নে বছরে অন্তত আট মাস তীব্র পানিসংকট থাকে। প্রায় ৪০ হাজার পানি সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।দাকোপের বাজুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শেখ মফিজুর রহমান বলেন, “অনেকেই ট্যাঙ্ক পেয়েছে, আবার অনেকেই পায়নি। যাদের বেশি প্রয়োজন, তারা অনেক সময় বঞ্চিত হয়।”সরকারি হিসাবে দেখা গেছে, লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন সম্ভব হয়নি। কোথাও কোথাও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে উপকূলের মানুষ এখনো নির্ভর করছেন বৃষ্টির পানি ও সীমিত কিছু বিকল্প উৎসের ওপর।স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ। তা না হলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।