জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর: যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম এখন তৃণমূল পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। স্বল্প খরচ, সহজ প্রক্রিয়া এবং দ্রুত নিষ্পত্তির কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন বাড়ছে এই বিচারব্যবস্থার ওপর, যার প্রতিফলন মিলছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে।২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে মনোহরপুর ইউনিয়নে মোট ১০২টি অভিযোগ দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি মামলা ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তির জন্য গ্রহণ করা হয় এবং বাকি ৩টি মামলা উচ্চ আদালতে দাখিল করা হয়েছে। দাখিলকৃত মামলাগুলোর মধ্যে ৯৩টি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে এসব মামলার সিদ্ধান্ত শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ৮টি মামলা বাতিল হয়েছে এবং বর্তমানে মাত্র ২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার মাধ্যমে মোট ১৮ লাখ ৮০ হাজার ২০০ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে, যা ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আর্থিক ক্ষতি পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয়দের মতে, গ্রাম আদালতের এই কার্যকর ভূমিকার কারণে দীর্ঘদিনের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে এবং সামাজিক সম্প্রীতিও বজায় থাকছে।স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের “বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)” প্রকল্পের যশোর ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার এ্যাড মহিতোষ কুমার রায় ১৫ এপ্রিল দুপুরে মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “মনোহরপুর ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শতভাগ বাস্তবায়ন সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য ইউনিয়নের জন্য একটি মডেল হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “গ্রাম আদালতকে আরও শক্তিশালী করতে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত মনিটরিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”এ প্রসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার ফারুক মিন্টু বলেন, “গ্রাম আদালত আমাদের ইউনিয়নের মানুষের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য বিচারব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। মানুষ খুব অল্প সময়ে এবং কম খরচে তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারছে। এতে গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকছে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি মামলা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিষ্পত্তি করতে এবং কোনো পক্ষ যেন বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করতে।”অন্যদিকে প্রকল্পের মণিরামপুর উপজেলা সমন্বয়কারী রোকেয়া খাতুন বলেন, “গ্রাম আদালতের কার্যক্রম এখন অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে। বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যাতে মানুষ সহজেই এই সেবা গ্রহণ করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, যা এখন সফলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।”স্থানীয় একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে তারা দ্রুত ন্যায়বিচার পাচ্ছেন এবং দীর্ঘদিনের বিরোধ সহজেই মিটে যাচ্ছে। ফলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক ক্ষেত্রেই কমে এসেছে এবং সময় ও অর্থ—দুইই সাশ্রয় হচ্ছে।গ্রাম আদালতের কাঠামো এবং কার্যপ্রণালীর কারণে এটি সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত সহজলভ্য একটি বিচারব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে সর্বোচ্চ তিন লক্ষ টাকা মূল্যমানের ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায় এবং আইনজীবী ছাড়াই পক্ষগণ নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া যেমন দ্রুত হয়, তেমনি ব্যয়ও থাকে অত্যন্ত কম।গ্রাম আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া মূলত সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যার ফলে শুধু বিরোধ নিষ্পত্তিই নয়, পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগও তৈরি হয়। এতে করে গ্রামীণ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই আদালত।গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হয় গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৪) এবং গ্রাম আদালত বিধিমালা ২০১৬ অনুযায়ী। প্রতিটি মামলার তথ্য নির্ধারিত রেজিস্টার ও ফরমে সংরক্ষণ করা হয়, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি মিথ্যা মামলা, সমন অমান্য বা আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান থাকায় বিচারপ্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলাও বজায় থাকে।সার্বিকভাবে মনোহরপুর ইউনিয়নের এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক বাস্তবায়ন, স্থানীয় নেতৃত্বের আন্তরিকতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে গ্রাম আদালত তৃণমূল পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর ও টেকসই মাধ্যম হিসেবে দেশের সর্বত্র বিস্তার লাভ করতে পারে।