তারিক লিটু, কয়রা (খুলনা):খুলনার কয়রা উপজেলার সংলগ্ন সুন্দরবনে আগামী ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। বন বিভাগের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে মৌয়ালদের নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। বৈধ পাশ (পারমিট) নিয়ে পর্যায়ক্রমে তারা বনে প্রবেশ করবেন। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলে।গত মৌসুমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ এলাকায় ২৪৮টি বৈধ পাশের বিপরীতে ১৭০৯ জন মৌয়াল বনে প্রবেশ করেন। তারা প্রাকৃতিক চাক থেকে ৮৫৪ দশমিক ৫ কুইন্টাল মধু ও ২৭৫ দশমিক ৫ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহ করেন।কয়রা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার একাধিক মৌয়াল জানান, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত মধুর চাহিদা দেশজুড়ে রয়েছে। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও তারা দলবদ্ধভাবে মধু সংগ্রহে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।তবে মধু আহরণে প্রতি বছরই জীবনঝুঁকির মুখে পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন মৌয়ালরা। বনের ভেতরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বিষধর সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি প্রতিকূল পরিবেশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগও বেড়েছে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনদস্যুদের চাঁদাবাজির কারণে অনেক মৌয়াল বনে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল অভিযোগ করেন, প্রতি জনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষেই পরিশোধ করা সম্ভব নয়।এক মৌয়াল জানান, গত মৌসুমে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি বাঘের মুখোমুখি হন। “হঠাৎ সামনে বাঘ দেখে আমরা চিৎকার করি এবং গাছের গায়ে আঘাত করতে থাকি। পরে বাঘ সরে গেলে দ্রুত নৌকায় ফিরে আসি,” বলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “মধু খোঁজা আর বাঘ খোঁজা প্রায় একই কথা—প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়।”বন বিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বনজ সম্পদ সংরক্ষণে নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও বনজ পরিবেশ ভালো থাকলে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়রাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মৌয়াল পরিবারের জীবিকায় স্বস্তি ফিরবে।