
সোহেল রানা,স্টাফ রিপোর্টার রাজশাহী :
রাজশাহীর বাগমারার তাহেরপুরে সেনাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্র ও আধুনিক ওয়াকিটকিসহ আলোচিত ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর দুই সদস্য আটকের পর মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে আদালত থেকে জামিনে মুক্তির ঘটনা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভোরে সেনা অভিযানের সাফল্য, দুপুরে পুলিশের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো এবং বিকেলেই জামিন-এই দ্রুত পালাবদলে পুরো বাগমারা এলাকা হতবাক ও ক্ষুব্ধ।
গত ২৩ জানুয়ারি শুক্রবার ভোরে সেনাবাহিনীর একটি অভিযানিক দল মেজর আসিফ রায়হানের নেতৃত্বে তাহেরপুর পৌর এলাকার মথুরাপুর মহল্লায় অভিযান চালিয়ে যুবদল কর্মী আব্দুল হালিম (২৯) ও আবু বাশার (২৭)কে আটক করে। তারা দুজনই এলাকায় বহুল আলোচিত ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত। অভিযানের সময় তাদের হেফাজত থেকে একটি পয়েন্ট ২২ বোরের এয়ার রাইফেল এবং একটি আধুনিক ওয়াকিটকি সেট উদ্ধার করা হয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ওই দিনই গণমাধ্যমকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সেনা ক্যাম্পে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুপুরে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ হালিম ও বাশারকে বাগমারা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অভিযোগ যাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর আদালতে পাঠানো হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। বরং ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে রাজশাহীর আদালতে পাঠানো হয়।
সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনা ঘটে আদালতে পাঠানোর পর। শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও এক ঘণ্টার নোটিশে বিশেষ উদ্যোগে আদালত বসানো হয় এবং আদালতে হাজির করার এক ঘণ্টার মধ্যেই হালিম ও বাশার জামিন পেয়ে যান। সন্ধ্যার মধ্যেই তারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিস্ময়, সন্দেহ ও ক্ষোভ আরও গভীর হয়।
এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাহেরপুর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে ‘সিক্স স্টার’ বাহিনী। স্থানীয় এক যুবদল নেতার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই বাহিনীর সদস্যরা পুকুর ও দীঘি দখল, ফসলি জমি জোরপূর্বক দখল করে পুকুর খনন, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, সন্ত্রাসী হামলা, মাছ লুট এবং হাট-বাজারে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে থানায় অভিযোগ জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না পাওয়ায় স্থানীয়রা শেষ ভরসা হিসেবে সেনা ক্যাম্প ও র্যাবের কাছে অভিযোগ করেন।
সেনাবাহিনী অস্ত্র ও ওয়াকিটকিসহ দুইজনকে আটক করার পরও কেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হলো—এ বিষয়ে বাগমারা থানার অফিসার ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম বলেন, সেনাবাহিনী যে এয়ার রাইফেল ও ওয়াকিটকি থানায় হস্তান্তর করেছে, সেগুলো নাকি গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে থানায় কোনো পূর্ব মামলা না থাকায় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। জামিনের বিষয়ে তিনি জানান, এটি আদালতের এখতিয়ার।
এ বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জরুরি মিটিংয়ে থাকার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, গত ২৮ নভেম্বর রাতে আলোচিত ‘সিক্স স্টার’ বাহিনী তাহেরপুর পৌর যুবদলের আহ্বায়ক এসএম আরিফুল ইসলামের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে হামলা চালিয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। ওই ঘটনায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র বলছে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বাহিনী এলাকায় বড় ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সেনাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ আটকের পরও এত দ্রুত জামিনে মুক্তির ঘটনা তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি স্থানীয় প্রভাব, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই নতুন করে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।